লামায় পাহাড় কাটা বন্ধে হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ, ৩ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বান্দরবানের লামা উপজেলায় ইটভাটার জন্য পাহাড় কাটা ও ধ্বংসের অভিযোগে এবার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাহাড় কাটা বন্ধে তিন দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রয়োজন অনুযায়ী এ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে স্থানীয় আর্মি ক্যাম্প কমান্ডারকেও নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালত একই সঙ্গে লামায় পাহাড় কাটা বন্ধে একটি মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। কমিটিকে কার্যকরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পাহাড় কাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ২৫ আগস্ট ‘বান্দরবানের লামায় ৪০ ইটভাটার জন্য পাহাড় ধ্বংস’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে লামা উপজেলায় ইটভাটার জন্য পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এসব প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনস্বার্থে পাহাড় কাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। রিটের শুনানি শেষে আদালত পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
আদালতের পৃথক আদেশে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান কার্যকর করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে অংশ নেওয়া সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পাহাড় কাটা বা ধ্বংসের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আইনের ১৫ ধারায় এ ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তি ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ইটভাটার মালিকরা পাহাড় কেটে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছেন। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আদালতের জারি করা রুলে লামা উপজেলায় পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, বান্দরবান জেলার পাহাড় কাটা ও ধ্বংস বন্ধে কেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং ইতোমধ্যে কেটে ফেলা পাহাড়গুলো পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পরিচালক, বান্দরবানের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় আর্মি ক্যাম্প কমান্ডারসহ মোট ১১ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট রিপন বারোই। শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল ও অ্যাডভোকেট নাছরিন সুলতানা। সরকার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দিন মো. হানিফ।
হাইকোর্টের এ নির্দেশের ফলে লামার পাহাড় কাটা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও আদালতের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড় কেটে ইটভাটার কাঁচামাল সংগ্রহের প্রবণতা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যই হুমকি নয়; এর ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভূমিরূপ পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্ষাকালে ভূমিধস, মাটি ক্ষয় ও আকস্মিক পানিপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ফলে পাহাড় কাটা বন্ধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।
হাইকোর্টের এ আদেশকে লামা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পাহাড় কাটা বন্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করে, সেটিই দেখার বিষয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।