জননিরাপত্তায় রামগড়ের দুর্গম পাড়ায় টহল দিচ্ছে বিজিবি, ‘আতঙ্কের গল্প’ শোনাচ্ছে ইউপিডিএফ

জননিরাপত্তায় রামগড়ের দুর্গম পাড়ায় টহল দিচ্ছে বিজিবি, ‘আতঙ্কের গল্প’ শোনাচ্ছে ইউপিডিএফ

জননিরাপত্তায় রামগড়ের দুর্গম পাড়ায় টহল দিচ্ছে বিজিবি, ‘আতঙ্কের গল্প’ শোনাচ্ছে ইউপিডিএফ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড় উপজেলার ২নং পাতাছড়া ইউনিয়নের দুর্গম হাচুক পাড়া ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ ঠেকানো এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবেই এসব টহল পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে নিরাপত্তাবাহিনীর এমন নিয়মিত টহলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে‘আতঙ্ক’, ‘হয়রানি’ কিংবা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরির মতো ভাষ্য ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত অপ-প্রচারমাধ্যমে বিজিবির নিয়মিত উপস্থিতিকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রামগড় উপজেলার হাচুক পাড়া এলাকায় বিজিবির একটি দল টহল পরিচালনা করে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুপুর দেড়টার দিকে একটি বিজিবি দল গাড়িযোগে সোনাই আগা পাড়া এলাকায় যায়। পরে সেখান থেকে হাচুক পাড়া ও আশপাশের এলাকায় টহল দিয়ে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে আসে।

নিরাপত্তাবাহিনীর এই চলাচলকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত ব্লগ সাইট ‘সিএইচটি নিউজ’ আবারও তাদের চিরাচরিত কৌশলে নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়মিত টহলকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাদের প্রকাশিত ব্লগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ‘আশঙ্কা’ ও ‘উদ্বেগের’ কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিজিবির টহল এবং স্থানীয়দের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতিই ওই এলাকার মানুষের জন্য মূল উদ্বেগের কারণ।

কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনীর টহলকে আতঙ্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বাস্তব নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যায়।

সীমান্ত ও দুর্গম এলাকায় টহল কেন জরুরি

রামগড়ের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোর বাস্তবতায় নিয়মিত টহল নিরাপত্তাবাহিনীর দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুর্গম পাহাড়ি পথ, সীমান্তবর্তী এলাকা এবং জনবসতি থেকে দূরের রুটগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান কিংবা অবৈধ পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত নজরদারি চালাতে হয়।

কোনো এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তাবাহিনীর পক্ষ থেকে আগাম টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে হয়রানি করা নয়; বরং সম্ভাব্য ঘটনা ঘটার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ফলে দুর্গম কোনো পাড়ায় নিরাপত্তাবাহিনীর টহল দেখা গেলেই সেটিকে ‘আতঙ্ক সৃষ্টি’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে টহলের উদ্দেশ্য ও ওই এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

টহল মানেই কি আতঙ্ক?

হাচুক পাড়া ও আশপাশের এলাকায় গত আগস্ট মাসেও বিজিবি ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের টহল ও নিরাপত্তা তৎপরতা ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ ধরনের নিয়মিত উপস্থিতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দুর্গম এলাকাগুলোকে নিরাপত্তা নজরদারির আওতায় রাখা।

পাহাড়ি অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শুধু উপজেলা সদর কিংবা প্রধান সড়ককেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রত্যন্ত পাড়া, পাহাড়ি পথ, সীমান্তঘেঁষা এলাকা ও দুর্গম যোগাযোগপথেও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কারণ এসব এলাকার দুর্গম ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠী সহজে আত্মগোপন বা চলাচল করতে পারে।

এ কারণে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহলকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই দেখা হয়।

অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজি ঠেকাতেও প্রয়োজন নজরদারি

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব শুধু অভিযান পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একটি এলাকায় নিয়মিত নিরাপত্তা টহল থাকলে অপরাধী ও চোরাকারবারিদের অবাধ চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি, অস্ত্রের উপস্থিতি কিংবা অবৈধ পণ্য পরিবহনের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ফলে নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতিকে শুধু একটি ‘ভয়’ হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে এর সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন।

একপাক্ষিক বয়ানে আড়ালে থাকে পাহাড়ের প্রকৃত নিরাপত্তা চিত্র

হাচুক পাড়ার সাম্প্রতিক টহল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতিকে স্থানীয়দের উদ্বেগের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও পাহাড়ে নিরাপত্তা টহলের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়নি।

ফলে একজন সাধারণ পাঠকের কাছে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, নিরাপত্তাবাহিনী কোনো কারণ ছাড়াই দুর্গম পাড়ায় গিয়ে টহল দিচ্ছে। অথচ বাস্তবে নিরাপত্তাবাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমান্ত পাহারা, অপরাধ প্রতিরোধ, চোরাচালান বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো একাধিক বিষয় রয়েছে।

নিরাপত্তাবাহিনীর কোনো কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন থাকলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়াও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো ঘটনাকে ‘আতঙ্ক’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাঠকের সামনে আসে না।

এই ব্লগ রিপোর্টের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—একটি সশস্ত্র সংগঠনের প্রচার মাধ্যম হিসেবে পরিচিত একটি ব্লগ সাইট বারবার ইচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর অবিশ্বাস তৈরির জন্য বিভ্রান্তিকর ভাষা ব্যবহার করছে, অথচ পাহাড়ে প্রকৃত সংঘাত, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে একটি শব্দও বলে না। এটি পরিষ্কারভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল নিয়মিত ও প্রয়োজনীয়। এসব টহলকে গুজব ছড়িয়ে আতঙ্কের রূপ দেওয়ার চেষ্টা আসলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ককে আড়াল করারই কৌশল। তাই পাঠকের উচিত—এ ধরনের প্রতিবেদনের উৎস, উদ্দেশ্য ও অতীত রেকর্ড বিবেচনা করা। পাহাড়ের শান্তি, উন্নয়ন ও সহাবস্থানের জন্য বিভ্রান্তি নয়—সঠিক তথ্যই সবচেয়ে জরুরি।

জনগণের নিরাপত্তাই টহলের মূল উদ্দেশ্য

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে বিজিবি, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিতভাবে দুর্গম এলাকায় যেতে হয়।

কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য পাওয়া গেলে আগাম টহল পরিচালনা করা, সন্দেহজনক চলাচল পর্যবেক্ষণ করা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা মূলত প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। এর মাধ্যমে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়মিত দায়িত্ব পালনের ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘আতঙ্ক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সেটি স্থানীয় জনগণ ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। এর সুযোগ নিতে পারে অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।

শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন দায়িত্বশীল তথ্য

রামগড়ের হাচুক পাড়ায় বিজিবির সাম্প্রতিক টহলকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতিকে কীভাবে দেখা হবে। নিয়মিত টহলকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আতঙ্ক বা হয়রানির সঙ্গে একাকার করা দায়িত্বশীল তথ্য উপস্থাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পাহাড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে যেমন জনগণের আস্থা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য। নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়মিত টহল যদি অবৈধ অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেটিকে জননিরাপত্তার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

হাচুক পাড়ার ঘটনাও তাই কেবল একটি টহল হিসেবে নয়, বরং দুর্গম সীমান্তবর্তী জনপদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।

আর পাহাড়ের মানুষকে ঘিরে যেকোনো তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি নয়—প্রকৃত তথ্য, বহুপক্ষের বক্তব্য এবং জনস্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed