৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ, ছয় বছরেও চালু হয়নি নানিয়ারচরের আনারস চিপস কারখানা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কৃষক ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় মৌসুমি ফলের বাজার সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নিয়ে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছিল আনারসের চিপস তৈরির কারখানা। প্রায় ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালের জুনের দিকে কারখানাটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি। নির্মাণের পর প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি কারখানাটি। ফলে স্থানীয় আনারস চাষি ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান ঘিরে যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। বর্তমানে কারখানাটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, কারখানাটি চালু হলে নানিয়ারচরে উৎপাদিত আনারসের পাশাপাশি কলা, মালটা, পেঁপেসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল প্রক্রিয়াজাত করে চিপস ও জুস তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফলের বাজার সম্প্রসারিত হবে, অন্যদিকে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে কারখানাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ফলভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠবে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কারখানাটি চালু না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, নানিয়ারচরের পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফলের ব্যাপক উৎপাদন হয়। আনারসের পাশাপাশি কলা, মালটা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফল এখানে পাওয়া যায়। কারখানাটি চালু করা গেলে এসব ফল স্থানীয়ভাবেই প্রক্রিয়াজাত করে চিপস ও জুসসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত ফলের জন্য নতুন বাজার তৈরি হবে এবং দূরবর্তী বাজারে ফল পরিবহনের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে বলে তারা মনে করছেন।

কৃষকদের দাবি, বর্তমানে অনেক সময় মৌসুমি ফল উৎপাদনের পর বাজারজাত করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে ফলের মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। স্থানীয়ভাবে ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা উৎপাদিত ফলের একটি অংশ কারখানায় সরবরাহ করতে পারতেন। এতে একদিকে অপচয় কমত, অন্যদিকে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পেতেন।

নানিয়ারচর মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. নূরুল ইসলাম বলেন, “এত টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় করে কারখানাটি নির্মাণ করা হয়েছে, অথচ এটি পড়ে থেকে কোনো কাজে আসছে না। কারখানাটি চালু হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন এবং স্থানীয়ভাবে আনারসের বাজারও বাড়বে।”
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু আনারস নয়, বিভিন্ন মৌসুমি ফলকে কেন্দ্র করে কারখানাটিকে বহুমুখীভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হলে নানিয়ারচরের কৃষি অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয়ভাবে ফল প্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজন করা গেলে কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বেকার যুবকরাও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকার তরুণদের জন্য কারখানাটি কর্মসংস্থানের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

তবে কারখানাটি কেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে আছে, তার অন্যতম কারণ হিসেবে দক্ষ জনবলের সংকটের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নানিয়ারচর উপজেলা হটকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. জোবায়দুর রহমান ভাসানী বলেন, “২০২০ সালে উদ্বোধনের পর দক্ষ জনবলের অভাবে কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারখানাটি পরিদর্শন করেছেন। কীভাবে এটি পুনরায় চালু করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।”

সরকারি অর্থে নির্মিত একটি সম্ভাবনাময় কারখানা ছয় বছর ধরে পড়ে থাকায় স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কারখানাটির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, যন্ত্রপাতি সচল করা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে। এতে সরকারি বিনিয়োগের সুফল যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি নানিয়ারচরের কৃষকদের উৎপাদিত ফলের নতুন বাজার তৈরি, কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন এবং স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

নানিয়ারচরের কৃষকরা তাই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা আনারস চিপস কারখানাটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী ফল উৎপাদনের পাশাপাশি এসব ফল স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। ছয় বছর আগে যে কারখানাকে ঘিরে কৃষক ও যুবকদের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি যেন আর পরিত্যক্ত স্থাপনা হয়ে না থাকে—এটাই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।