অরক্ষিত পানছড়ি সীমান্ত, ঝুঁকিতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা
![]()
মেজর নাসিম (অবঃ)
গত কয়েক দিন হলো খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা পানছড়িতে পাহাড়ি আঞ্চলিক দল চুক্তি পক্ষের জেএসএস ও চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ এর মধ্যে ভয়াবহ গোলাগুলির খবর পাওয়া যাচ্ছে। উভয় দলই মারাত্মক রকমের বিধ্বংসী অস্ত্রে সজ্জিত। তারা সরকারের প্রশাসনকে এক প্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সোশাল মিডিয়ায় তাদের কর্মকাণ্ডের সগৌরব ছবি ভিডিও পোস্ট করে যাচ্ছে। কৌতুহল জনকহলো আমরা একই সাথে সেনাবাহিনীর নানান রকম সমাজকল্যাণমূলক কাজের চিত্র দেখছি।
কোথাও সেনাবাহিনী মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনের আওতায় নিরাপদ প্রসব (ধাত্রীবিদ্যা), গাড়ি মেকানিক, মোবাইল মেকানিক, কম্পিউটার প্রশিক্ষন, সেলাই প্রশিক্ষন দিচ্ছেন। বেকার যুবকদের এসব কর্মসংস্থান মূলককাজে নিয়োগ করে তাদের জীবনকে সন্ত্রাসমূলক কাজ থেকে দূরে রাখা।
কিন্তু তার একটা প্রভাব এলাকায় পড়ছে বলে বোধগম্য হচ্ছে না। পানছড়ির তরুন প্রজন্ম যেন এখনো সন্ত্রাসে মোহাচ্ছন্ন আছে।
পানছড়িতে বর্তমানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি খুবই নগন্য। কারন শান্তি চুক্তির আওতায় অনেক ক্যাম্প গুটিয়ে আনা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো রমনীপাড়া ও পুঁজগাও ক্যাম্প। পানছড়ির ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। কারন এর সাথে আছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সহজ যোগাযোগ।
১৯৭৫ সালে এই পানছড়ির সীমান্তবর্তী ভগবান টিলার নীচ দিয়ে ভারত থেকে প্রথম অস্ত্রের চালান পায় শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমা। এই পথেই সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে আসতো শান্তি বাহিনীর নেতারা।
পানছড়ি এলাকা ছিলো ২৩ বছরের সংঘাতপূর্ন কর্মকান্ডের হৃদপিন্ড। শান্তি চুক্তির পূর্বে ২৩ বছর এখানে সেনাবাহিনীর সাথে শান্তি বাহিনীর রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছে। পাহাড়ি-বাঙালীর মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছে। বাঙালী মুসলমানের উপর অকল্পনীয় নৃশংসতা চালিয়েছে শান্তি বাহিনী। তার মধ্যে ১৯৮৬ সালের গ্রেট নালকাটা কিলিং, ১৯৯২ সালের লোগাং কিলিং।
পানছড়ি জেএসএসের কার্যক্রম চালানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সীমান্তের ওপারে অবাধ যাতায়াতের সুবিধার কারণে পানছড়ি থেকে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে গেরিলা কার্যক্রম পরিচালন করা হয়। পানছড়ি যার দখলে পুরো খাগড়াছড়ি, দিঘীনালা, বাঘাইছড়ি, লক্ষীছড়ি এক দিকে, অন্য দিকে লোগাং, ভগবান টিলা, তাইন্দং, তবলছড়ি মাটিরাঙ্গা পর্যন্ত তাদের দখলে। পানছড়ির কেন্দ্র দখলে থাকলে রিজার্ভ ফরেস্ট, মাইনী মিশন কাচালং শিলছড়ি থেকে ভারতের অভ্যন্তর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমানে নির্মিতব্য সীমান্ত সড়ক পানছড়ি সংলগ্ন দুদকছড়া হয়ে বিজিবি ক্যাম্পগুলোকে ছুয়ে সর্ব উত্তরে যেয়ে সাজেককে সংযুক্ত করবে। পানছড়িতে নিয়ন্ত্রণ মানে রিজার্ভ ফরেস্টের নিয়ন্ত্রণ। রিজার্ভ ফরেস্ট শুধু টাকার উৎসই নয়, এটা সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষন, রসদ মজুদ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। নিকট অতীতে পুঁজগাও এবং রমনীপাড়া ক্যাম্প থেকে গহীন অরণ্যে অভিযান পরিচালনা করা হতো। বর্তমানে সেখানে কোন সেনা ক্যাম্প নাই। অত্যন্ত আনাড়ি মনোভাব থেকে এই দুটো ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যার কুফল, পুরো এলাকাটি এখন জেএসএস বনাম ইউপিডিএফের করতলে চলে গেছে। ইউপিডিএফ মোটামুটি এক তরফাভাবে ২০১৬ পর্যন্ত এলাকাটিকে তাদের দখলে রেখে ছিলো। কিন্তু নিম্নমানের নেতৃত্ব, নেতৃত্বের দূর্নীতি, ক্যাডারদের পরিচালনায় অদক্ষতার কারনে তারা এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। বর্তমানে ইউপিডিএফ তার প্রতিদ্বন্ধীদের তুলনায় অনেকটা ব্যাকফুটে আছে।
২০০১ সালের দিকে জেএসএসের প্রত্যাগত শান্তি বাহিনীর সদস্যরা সদ্য গঠিত ইউপিডিএফের অপেক্ষাকৃত তরুন সদস্যদের হাতে নিগৃহীত হতে হতে জনগণ ও ভূমির উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। তারা পানছড়ি সদর ও নিরাপত্তা বাহিনীর পোষ্টগুলোর আশেপাশে গৃহ নির্মাণ করে জীবন-যাপন করতে থাকে। এসময় অনেক সুবিধাভোগী দলে ঢুকে সরকারের সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে থাকলে জনগনের কাছে তারা বিতর্কিত হয়ে পড়ে। তার উপর বিগত সময়ে শান্তি বাহিনীর হাতে অকারণে নিগৃহীত হওয়ার জন্য অনেকের ক্ষোভের লক্ষ্য বস্তুতে পরিনত হয় তারা। এসময় বেশ কিছু গুপ্ত হত্যার শিকার হয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়ে জেএসএস।
পানছড়ি সদরের সেনাবাহিনীর জোন হেডকোয়ার্টারটি সরিয়ে ফেলায় সামরিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। ইউপিডিএফ একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা মাস ছয়েক আগে পানছড়ি জোন সদরের অতি নিকটে (২শ গজ) এসে প্রতিদ্বন্ধী গ্রুপের হয়ে কাজ করা এক বাঙালী যুবককে হত্যা করে তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করে যায়।
এটা এতটাই ঔদ্ধত্যপূর্ন একশন ছিলো, যারা ইতিপূর্বে এখানে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নিকটে চরম অবিশ্বাস্য মনে হবে। এ পর্যন্ত পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আসবে ওরা এতটা সাহস কোথা থেকে পায়?
আমার ধারণা: সেনাবাহিনীর প্রদত্ত টাস্ক এবং রুলস অফ বিজনেসের মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন এসে থাকবে।
সেনাবাহিনী এখন রিকনসিলিয়েশন বা স্থানীয় জনগনের সাথে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর কাজে বেশি মনযোগী। হার্ডকোর মিলিটারী অপারেশনের কাজের চেয়ে সমাজ কল্যানমুখী কাজে স্থানীয় তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করে তাদের মানসিকতাকে Entrepreunership এর দিকে চালিত করতে মনোযোগী হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা হলো এখানের শক্তিশালী গ্রুপগুলো তরুণদেরকে নিজ স্বার্থে ব্যবহারের জন্য উদগ্রীব থাকে। কিন্তু পানছড়ির বাস্তবতা হলো, এখানের তরুন সমাজ এবং সামাজিক নেতারা দারুণভাবে বিভাজিত এবং তাদের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মান অনেক উঁচুতে। বলাবাহুল্য তারা প্রথাগতভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সমালোচনামুখর এবং বিরূপ ধারণা পোষণ করে। সেনাবাহিনীর কোন লোকের সাথে আলাপচারিতাকেও তির্যক দৃষ্টিতে দেখে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেএসএস তাদের সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করেছে, নতুন অস্ত্রে সজ্জিত করেছে। দলে তরুন রিক্রুটদের অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্যনীয়। ইউপিডিএফের অব্যাহত চাপে, অপহরণ ও গুমের কারনে স্থানীয় জনগনের মাঝে তাদের প্রাথমিক সময়ে যে জনাকূল্য ছিলো তা ঘুরে গেছে। ইউপিডিএফ শুরুতে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন এনে দেবার নতুন চাঁদ দেখিয়ে জনগনের মাঝে আলোচনার সৃষ্টি করে। গত ২৭ বছরে ইউপিডিএফ কোন ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্য লাভ করতে পারেনি। তারাও জেএসএস’র মত বিদেশি অপহরণ করে (২০০১ সালে) চমক সৃষ্টি করে। বাঙালী হটাও বলে কিছু জায়গায় পাহাড়ি-বাঙালী জাতিগত সংঘাতের সূচনা করে তাতে বিক্ষোভের আগুন ঢেলেছে। সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে কাল্পনিক রেইপ এর গল্প ফেঁদে জনগনকে রাস্তায় উসকিয়ে দিয়েছে।
এরকমটা জেএসএস’র ছাত্র ও নারী সংগঠনগুলোও করতো। জনগণ দেখেছে ইউপিডিএফ সামরিক বাহিনীর সাথে কোন সংঘাতে জড়ায়নি, সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্যনীয় মাত্রায় কমেনি। বহুল প্রত্যাশিত বাঙালী বসতিকারীগনও পাহাড় ছেড়ে চলে যায়নি। পাহাড়িরা দেখলো ইউপিডিএফের পূর্ন স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন একটা অধরা স্বপ্নই থাকবে।
মায়ানমারের চলমান সংঘাত জেএসএস’র জন্য পুনঃগঠনের বড় সুযোগ নিয়ে আসে। মায়ানমারের সরকারি বাহিনীর পশ্চাৎপসারন গেরিলা বাহিনীর জন্য অস্ত্র সংগ্রহের মওকা সৃষ্টি করে। বিদ্রোহী দলগুলো তাদের অতিরিক্ত অস্ত্র আশেপাশের বন্ধু ভাবাপন্ন গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করে দেয়। সম্ভবত এরকম একটা সুযোগ কাজে লাগাতে সন্তু লারমা গত বছর চিকিৎসার নামে ভারত যান। একটা লম্বা সময় পর দেশে আসেন। তারপরই সন্তু লারমার গ্রুপ পানছড়িসহ অনেক স্থানে শক্তিশালী হয়ে উঠে। এখানেই একটা পুরাতন শংকা জেগে উঠে।
১৯৮৩ সালে জেএসএস সভাপতি এম এন লারমার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে যে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দেয়- জনসাধারণের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়, সেনাবাহিনী শান্তি বাহিনীর আগোছালো অবস্থার সুযোগ নিয়ে আক্রমণ তীব্র করে। এরকম পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শান্তি বাহিনী খাগড়াছড়ি রিজিয়নের সব বাঙালী পাড়ায় রাতের অন্ধকারে গনহত্যা চালিয়ে সরকার এবং সেনাবাহিনীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।
সেই পুরাতন শংকা থেকে এবং পানছড়ির বর্তমান অবস্থা থেকে এটা আশংকা করা যায় যে, পানছড়িতে আবার ১৯৮৬ সালের মত কোন বড় ধরনের হামলা হতে পারে বাঙালী পাড়ায়, নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্বল পোস্টে বা সরকারি কোন স্হাপনায়। সে রকম কিছু ঘটার আগেই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে তা প্রমান করতে অতি দ্রুত পানছড়ির মেইন ব্যাটেল পীচগুলো দখল করে রাখা উচিত।
আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: পানছড়িতে দাপিয়ে বেড়ানো দলগুলোর শক্তি ও সামথ্যকে যেন আর অবমূল্যায়ন না করা হয়। তারা অস্ত্রের মানে সেনাবাহিনীর সমকক্ষ। আগের জামানার ৩০৩ রাইফেল তারা ব্যবহার করে না। সেনাবাহিনীর যা আছে তা তাদেরও আছে। তাদের বড় এডভান্টেজ সশস্ত্র দলের সদস্যদের বয়স। তাদের গড় বয়স ২২/২৩। খুব হিসাবে নেওয়ার মত ফ্যাক্টর। সেনাবাহিনীর সদস্যদের গড় বয়স আরো অনেক বেশি। দিন শেষে ফিটনেস নিয়ামক। পাহাড়ে সংঘাতের সময় সবাই উরাধুরা ফায়ার করে।
এখন সেনাবাহিনীকে অভিযানে যেতে হলে অবশ্যই এয়ার সাপোর্ট নিয়ে যেতে হবে। এখন ড্রোন সব হিসাবে রাখতে হবে: ফায়ার সাপোর্ট, লজিস্টিক, ইভাকুয়েশন, কমিউনিকেশন।
আর মেকানাইজড ফোর্স (এপিসি মাউন্টেড) যতটা গভীরে করা যায় ততই মঙ্গল। সেনাবাহিনীর অপারেশন ঘন ঘন ও অনির্দিষ্টকালের জন্য হতে পারে। অপারেশন যদি রুটিন টাইপের হয় তার সাফল্য সীমিত।
দীর্ঘদিন পানছড়ির ব্যাটেল গ্রাউন্ডগুলি ফেলে রাখলে শত্রু সেগুলোকে ফর্টিফাইড পজিশনে পরিনত করে ফেলবে। সেখানে কোন ফরেন গেষ্ট এডাভ্যান্স পজিশন হিসাবে সেগুলোকে ব্যবহার করতে পারে।।
আশা করবো অরক্ষিত পানছড়িতে যেন দ্রুত এবং কার্যকরী অভিযান অতিদ্রুত শুরু হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।