মিয়ানমারে জান্তা সমালোচনায় গ্রেপ্তার ২ হাজারের বেশি, অনলাইনে নীরবতা

মিয়ানমারে জান্তা সমালোচনায় গ্রেপ্তার ২ হাজারের বেশি, অনলাইনে নীরবতা

মিয়ানমারে জান্তা সমালোচনায় গ্রেপ্তার ২ হাজারের বেশি, অনলাইনে নীরবতা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারে সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে গত পাঁচ বছরে দেশটির জান্তা সরকার ২ হাজার ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘ডেটা ফর মিয়ানমার’-এর এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকই দেশটির দুই বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের বাসিন্দা। এ দুই শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৬৯ জনকে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ।

অনলাইনে জান্তাবিরোধী মত প্রকাশের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে ফেসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে। এ ধরনের ঘটনায় ১ হাজার ৮৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো ঘটেছে ভাইবার, টিকটক, টেলিগ্রাম ও ইউটিউবের মতো অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বা শেয়ার করা জান্তাবিরোধী বক্তব্যের কারণে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই ফেসবুক ও টুইটার (বর্তমানে এক্স)সহ বড় কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার সীমিত করে মিয়ানমারের জান্তা। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য দেশটির নাগরিকদের বড় একটি অংশ ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার শুরু করেন।

‘ডেটা ফর মিয়ানমার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন আরও জোরদার করে জান্তা। এ সময় সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও উসকানিসংক্রান্ত বিভিন্ন আইনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার শুরু হয়।

গবেষণা সংস্থাটি বলছে, অনলাইনে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে জান্তা একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর চেকপোস্টগুলোতে নিয়মিত নাগরিকদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করা হচ্ছে। ফোনে জান্তাবিরোধী কোনো কনটেন্ট পাওয়া গেলে ঘটনাস্থলেই গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে।

এ ছাড়া সামরিকপন্থী টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে জান্তাবিরোধী পোস্ট বা কনটেন্ট তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি জান্তাবিরোধী কোনো পোস্টে শুধু ‘লাইক’ দেওয়ার কারণেও কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি।

প্রথম দিকে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ওপর বেশি নজরদারি চালানো হলেও ২০২৩ সাল থেকে টিকটকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই দমন-পীড়নের আওতায় এসেছে। এর ফলে অনলাইনে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ডেটা ফর মিয়ানমার’ জানায়, অনলাইনে জান্তাবিরোধী মতপ্রকাশের ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। তবে এর অর্থ অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে—এমন নয়। বরং গ্রেপ্তারের ভয়ে মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবেদনশীল কোনো বক্তব্য প্রকাশ বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকছেন।

চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে জান্তাবিরোধী মতপ্রকাশের অভিযোগে ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গবেষণা সংস্থাটি দ্য ইরাবতীকে জানায়, মানুষ এখন সংবেদনশীল কোনো কনটেন্ট পোস্ট বা শেয়ার করার বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। বিশেষ করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের সময় নিজেদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়েও তারা বেশি সচেতন থাকছেন।

ইয়াঙ্গুনের এক বাসিন্দা জানান, অনেকেই ফেসবুকের পরিবর্তে টিকটক ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে সেখানেও এমন কোনো পোস্ট দেওয়া বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকছেন, যা জান্তা সরকারের নজরে পড়তে পারে। তাঁর দাবি, মোবাইল ফোনে ফেসবুক অ্যাপ পাওয়া গেলেও জান্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে ‘ডেটা ফর মিয়ানমার’-এর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বছরের শুরুতে জান্তা-নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের সমালোচনা করে গ্রেপ্তার হওয়া শত শত মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ওই নির্বাচনের বিরুদ্ধে অনলাইনে পোস্ট করা কিংবা জান্তাবিরোধী নির্বাচনী কনটেন্টে ‘লাইক’ দেওয়ার অভিযোগে ৪০০ জনের বেশি মানুষকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে চলচ্চিত্র পরিচালক ও একজন কৌতুকশিল্পীও ছিলেন।

ফলে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রটি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। গ্রেপ্তার ও নজরদারির আশঙ্কায় অনেক ব্যবহারকারী প্রকাশ্যে মতামত দেওয়া থেকে সরে যাওয়ায় দেশটির অনলাইন পরিসরে জান্তাবিরোধী বক্তব্যের দৃশ্যমানতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed