চীনের উত্থানের সাক্ষী থেকে অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে
![]()
অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি, এমবিএ, এমডিএস
প্রতি বছর ১ অক্টোবর চীন জাতীয় দিবস উদযাপন করে। ২০২৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন তার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে। তবে আমার কাছে চীনের জাতীয় দিবস শুধু একটি রাষ্ট্রীয় উৎসব নয়; এটি এমন একটি দেশের পরিবর্তন ও অগ্রযাত্রার দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ, যার রূপান্তর আমি প্রায় চার দশক ধরে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। একই সঙ্গে এই রূপান্তর বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা ও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও ভাবার সময়।
১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরে আমি প্রথম বেইজিংয়ে যাই চীনা ভাষা শিক্ষার্থী হিসেবে। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট, যা বর্তমানে বিশ্বখ্যাত বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি (বিএলসিইউ)। সে সময় চীন সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতিকে আরও গভীরভাবে এগিয়ে নিচ্ছিল। সেই সময়ের চীন আর আজকের চীন—আমার চোখে—অবিশ্বাস্যভাবে ভিন্ন।
মাও সেতুং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি চীনের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। পরবর্তী সময়ে চিয়াং জেমিন, চু রংজি, হু চিনথাও ও সি চিনপিংয়ের নেতৃত্বে এবং অসংখ্য চীনা কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, পিপলস লিবারেশন আর্মির সদস্য ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই জাতীয় রূপান্তর অব্যাহত থাকে।
এর ফল আজ চীনের অবকাঠামো, উৎপাদনশিল্প, উচ্চগতির রেল, বন্দর, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিতে দৃশ্যমান। ২০২৫ সালে চীনের জিডিপি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি হয়েছে।
তবে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে চীনের উত্থানকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বেইজিং, সাংহাই ও শেনচেন থেকে শুরু করে গুয়াংচৌ, কুনমিং, সি’আন, ছংছিং, হারবিন, হাইনান ও কুইচৌ—চীনের বিভিন্ন অঞ্চল আমি ঘুরে দেখেছি। বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ই’উ ও ওয়েনচৌতেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শহর ও অবকাঠামোর বিস্ময়কর পরিবর্তন যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি সাধারণ চীনা মানুষের আকাঙ্ক্ষা, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম।
চীন সম্পর্কে আমার উপলব্ধি আরও গভীর হয়েছে পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। দোভাষী হিসেবে চীনের তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চিয়াং জেমিন ও চু রংজির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি এবং চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সামরিক পর্যবেক্ষক ও টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় চীনা সহকর্মীসহ বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষী সদস্যদের সঙ্গে কাজ করেছি।
এসব অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, চীনের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাসেরও গল্প।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশ ও চীন ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সরকারগুলোও এই সম্পর্ক সম্প্রসারণে অবদান রেখেছে।
২০১০ সালের জুনে তৎকালীন চীনা ভাইস প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বাংলাদেশ সফর করেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর করেন। বছরের পর বছর দুই দেশের সহযোগিতা বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ওই দিন বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই নেতা যৌথভাবে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় যোগাযোগব্যবস্থা, বাণিজ্য, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল, সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। বন্দর, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই নতুন কাঠামো কীভাবে সাধারণ বাংলাদেশির জীবনে বাস্তব সুফল বয়ে আনবে?
পারস্পরিক লাভের সহযোগিতাকে দৃশ্যমান করা
পারস্পরিক লাভের সহযোগিতার অর্থ হওয়া উচিত বাংলাদেশিদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভ্রমণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, দক্ষতা অর্জন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নে অংশগ্রহণের আরও সুযোগ সৃষ্টি করা।
এ লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বিমান যোগাযোগ আরও বাড়ানো, শক্তিশালী সমুদ্র যোগাযোগ গড়ে তোলা এবং পরিস্থিতি অনুকূল হলে মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের স্থল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার সঙ্গে দেশের আট বিভাগের সদর দপ্তরের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও কার্যকর করার যে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে চীনের উচ্চগতির রেল উন্নয়নের অভিজ্ঞতাও মূল্যবান হতে পারে।
তবে উন্নয়নের গল্প শুধু অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে হলে চলবে না।
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করতে হবে মানুষের ওপর। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে চীনা ভাষা শিক্ষাদানের জন্য বাংলাদেশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে চীনের সহযোগিতা একটি নতুন প্রজন্মের ভাষাগত ও পেশাগত সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে আবাসিক সুবিধাসহ একটি বড় বাংলাদেশ-চীন কারিগরি ও চীনা ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। সেখানে চীনা ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তি, শিল্পনিরাপত্তা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে বাংলাদেশ-চীন গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র (CBRDC – China Bangladesh Research and Development Center)। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংকট্যাংক, ব্যবসায়ী মহল এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এ কেন্দ্র পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করতে পারে।
ঢাকার বাইরে একটি বাংলাদেশ-চীন কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে। ব্যবসা, প্রদর্শনী, ব্যাংকিং, পর্যটন, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য এটি একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
এসব কেবল অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব নয়; এগুলো দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিনিয়োগ।
বন্ধুত্ব থেকে অভিন্ন উন্নয়নের পথে
বাংলাদেশের প্রয়োজন চীনের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ। অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি স্থিতিশীল, সংযুক্ত ও অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল বাংলাদেশ চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
তাই সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ শুধু প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ না রেখে যৌথ উন্নয়ন, জ্ঞান বিনিময় এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের দিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃত পারস্পরিক লাভের অংশীদারত্ব এমন হওয়া উচিত, যেখানে বাংলাদেশিদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে চীনা ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই নতুন পর্যায়ে শক্তিশালী গতি সৃষ্টি করতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
১৯৮৮ সালে আমি প্রথম চীনকে দেখেছিলাম—তখন দেশটির রূপান্তর প্রক্রিয়া মাত্র আরও গভীরভাবে এগিয়ে চলেছে। আজ, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি নিজের উন্নয়নের নিজস্ব পথও আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ পেয়েছে।
‘অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন কমিউনিটি’—এই ধারণাটি যেন কেবল কূটনৈতিক পরিভাষা হয়ে না থাকে। এর অর্থ হওয়া উচিত এমন শ্রেণিকক্ষ, যা নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে; এমন প্রযুক্তি, যা উৎপাদনশীলতা বাড়াবে; এমন ব্যবসা, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে; এমন অবকাঠামো, যা মানুষকে আরও কাছে আনবে; এবং এমন পারস্পরিক বিনিময়, যা বাংলাদেশি ও চীনা জনগণকে একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।
চীনের উত্থানের সাক্ষী হওয়া থেকে অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে—বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় হওয়া উচিত এটাই।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি, এমবিএ, এমডিএস
অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ (আইপিএল), বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি
চীনা ভাষায় স্নাতক, বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি
প্রতিষ্ঠাতা, মহাসচিব ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড
প্রতিষ্ঠাতা/স্বত্বাধিকারী/ফ্যাকাল্টি ও সিনিয়র গবেষক, ঝং মেং চাইনিজ একাডেমি ও ঝং মেং এন্টারপ্রাইজ
সাবেক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চীনা-ইংরেজি-বাংলা দোভাষী
চীন-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ড-২০২৩ প্রাপক
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও চীনা ভাষা শিক্ষা বিষয়ক প্রমোটার ও কনসালট্যান্ট
ই-মেইল: shahadatb@gmail.com
মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপ: +৮৮০১৭১৬০৯৭৮৭৪