মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘রোহিঙ্গাদের চোখে জীবন - Southeast Asia Journal

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘রোহিঙ্গাদের চোখে জীবন

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

লাল ওড়নায় মাথা ঢেকে রাখা এক শিশু। একটি ভাঙা মুঠোফোনের দেখা মেলে তার হাতে। অচল সে মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বলে কিছু নেই। রয়েছে শুধু পেছনের খোলসটি। সেই খোলসের উল্টোদিক থেকে গোলাকৃতির ছিদ্র দিয়ে বিহ্বল নয়নে তাকিয়ে রয়েছে ছোট্ট মেয়েটি। দুই চোখে যেন শুধুই শূন্যতা। যে শূন্যতায় মিশে রয়েছে দেশ ও দিশেহারা জীবনের বেদনা। রয়েছে মাতৃভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার যন্ত্রণা; যা কিনা অস্পষ্ট এক ভবিষ্যতের বয়ান হয়ে ধরা দিয়েছে। আলোকচিত্রটি ঠাঁই পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৫ নম্বর গ্যালারিতে। প্রদর্শনালয়টির দেওয়ালে ঝুলছে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শরণার্থী জীবনের এমন অনেক ছবি।

আলোকচিত্রগুলোয় উঠে এসেছে কক্সবাজার আশ্রয় শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের যাপিত জীবনের নানা অধ্যায়। সেই সুবাদে জলাবদ্ধ ভূমিতে বুকসমান পানিতে বৃদ্ধার হেঁটে যাওয়া কিংবা একঝাঁক খেয়ালি কিশোরের স্যান্ডেলকে মুঠোফোনে রূপ দিয়ে সেলফি তোলার দৃশ্যটি কড়া নাড়ে যে কোনো মানবিক মানুষের মনে। এসব ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছেন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গা আলোকচিত্রীরা। সেসব ছবি নিয়ে চলছে ‘রোহিঙ্গাদের চোখে জীবন’ বা ‘জিন্দেগী রোহিঙ্গার সুকর্তু’ শীর্ষক প্রদর্শনী। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনের সমান্তরালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের শরণার্থীদের ছবির সম্মিলনে সাজানো হয়েছে এই প্রদর্শনী।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহযোগিতায় ইউএনএইচসিআর ও রোহিঙ্গাটোগ্রাফার নামের ম্যাগাজিন এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। নির্যাতনের মুখে মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য হওয়া ভাগ্যাহতদের রক্ষা ও তাদের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রদর্শনীটির আয়োজন করা হয়েছে। কক্সবাজারে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গা আলোকচিত্রীদের তোলা ৫০টি এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী শিবিরের ১১টিসহ মোট ৬১টি আলোকচিত্রে সজ্জিত হয়েছে বিশেষ এই প্রদর্শনী।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের একটি সাঁকোর ছবি তুলেছেন সাহাত জিয়া হিরো। সে ছবিতে নড়বড়ে ও কিছুটা হেলে পড়া সেতুতে পারাপারের দৃশ্যকল্প ধরা দিয়েছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে ‘যখন কোনো কিছু ভেঙে যায় তখন তা ক্ষয় হতে শুরু করে। যত বেশি ক্ষয় হয় ভাঙন তত বাড়ে। এমনটাই আমাদের শিবিরে ঘটেছে। সব কিছু এবং সবার ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে। আশ্রয় শিবিরে খুপড়ি ঘরে বসবাসের দুর্দশার ধারাভাষ্য হুজ্জাত উল্লাহর তোলা ছবিটি। ২০১৭ সালে তিনি যখন আশ্রয় শিবিরে আসেন তখন ছিল অসহনীয় গরম। ছোট ছোট ঘরগুলোতে এই গরম ছিল আরও অসহনীয়।

এছাড়া প্রদর্শনীর ছবিগুলোয় উঠে এসেছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার অবর্ণনীয় দুর্দশার চিত্র। উল্টোপিঠে আশ্রয় শিবিরের গোধূলিলগ্নের মায়াবী দৃশ্যময় ছবিটি যেন মেলে ধরেছে আগামীর সম্ভাবনা। ছবিটির আলোকচিত্র রো. মনসুর আলী ক্যাপশন লিখেছেন, ‘এই সূর্যান্ত প্রমাণ করে, শেষ কখনো কখনো সুন্দর হতে পারে। একইভাবে রোহিঙ্গারা আশা করে একদিন সুন্দরভাবে তাদের কষ্টের অবসান ঘটবে।

আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী। প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।