বান্দরবান সদরেই পানির জন্য হাহাকার, অস্বাস্থ্যকর ছোট্ট ‘কুয়া’ই ভরসা
![]()
নিউজ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি শেষ হতে না হতেই পাহাড়ে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে টিউবওয়েল ও রিংওয়েলের পানি কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে খালের পাশে খোঁড়া বিশেষ ধরনের গর্তে জমা হওয়া পানিই খাবার ও নিত্য কাজে ব্যবহার করছেন পাহাড়িরা।
পানি সংগ্রহের এসব ছোট ছোট উৎস তাদের কাছে পরিচিত ‘কুয়া’ হিসেবে, যা একনজরেই বলে দেওয়া যায় পানির স্বাস্থ্যকর উৎস নয়।
পাহাড়ে শুষ্ক এ মৌসুমে পানি সংকটের খোঁজ নিতে খুব বেশি গহীনে যেতে হয় না। বান্দরবান সদরের সুয়ালক ইউনিয়নের আমতলি মারমা পাড়া গ্রামেই দেখা মিলল এ চিত্রের।
ওই গ্রামে ১৬০ পরিবারের জন্য রয়েছে একটি টিউবওয়েল ও দুটি রিংওয়েল। শুষ্ক মৌসুমে এগুলো থেকে পর্যাপ্ত পানি ওঠে না। ফলে সকাল থেকেই পানি নিতে লাইনে দাঁড়াতে হয় পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যকে। অনেকে সময় বাঁচাতে খালের পাশে গর্ত খুঁড়ে তৈরি ‘কুয়া’র পানি সংগ্রহ করেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, পাহাড়ে সাধারণত প্রতিবছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে বিভিন্ন এলাকায় ধীরে ধীরে পানি সংকট শুরু হয়। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কোনো রকমে দিন কাটানো গেলেও মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সংকট চরম আকার ধারণ করে। বর্ষা না আসা পর্যন্ত এই দুর্ভোগ চলতেই থাকে।
আমতলি মারমা পাড়া এমনই একটি জনপদ। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বাকি সময়টায় সেখানে সুপেয় পানির তীব্র সংকট থাকে। গৃহস্থালি কাজ, কাপড় ধোঁয়া কিংবা গোসল আপাতত খালের পানিতে করা গেলেও খাবার পানির সংকটই সবচেয়ে বেশি।
বাধ্য হয়ে রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকি নিয়েই পাড়ার পাশের সুয়ালক খালের কাছে তৈরি বিশেষ ধরনের এসব গর্তে (যা পাহাড়িদের কাছে কুয়া নামে পরিচিত) জমে থাকা পানিই পানযোগ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন তারা।
কেমন এসব কুয়া?
পাহাড়ি এলাকায় খালের পাশে গর্ত খুঁড়ে অথবা পাথরের ভাঁজে পানি জমিয়ে রাখার পদ্ধতিকেই ‘কুয়া’ বলা হয়। গর্ত করার আগে চারিদিকে অল্প পরিমাণ বালু দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। পরে গর্ত খুঁড়লে সেখানে নিচ থেকে পানি উঠে আসে বলে এগুলো কুয়া হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
খালের ঠিক পাশে উন্মুক্ত স্থানে তৈরি এসব কুয়ায় ধুলা, ময়লা-আবর্জনা পড়ার যেমন আশঙ্কা থাকে, তেমনি জীবাণু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পাহাড়ে এমন কুয়ার পানি খাওয়া প্রাচীন একটি পদ্ধতি। স্যাঁতস্যাতে পাথুরে বা বালু এলাকায় গর্ত খোঁড়ার পর ভেতর থেকে পানি বের হয়ে আসে। বেশ কিছুক্ষণ পর এতে পানি জমে যায়। এরপর পানি সংগ্রহ করা হয়।
পানি সরবরাহের আধুনিক পদ্ধতি আসার আগে এভাবেই কুয়ার পানি পান করতেন পাহাড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন।

টিউবওয়েলে নেই পর্যাপ্ত পানি
আমতলি পাড়ার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব উসাইঅং মারমা বলেন, “আনুমানিক ৩০০ বছরের বেশি আমতলি মারমা পাড়ার বয়স। তখন পরিবার সংখ্যা কম ছিল। জনসংখ্যাও কম ছিল। চারপাশে ঘন বনজঙ্গল ছিল। খালের পানির প্রবাহ ভাল ছিল। সারাবছরই পানি থাকত। এখনকার মত এত তীব্র সংকট ছিল না। তবে তখনও খালের পাশের গর্ত খুঁড়ে খাবারে পানি হিসেবে খাওয়া হত। কোনো টিউবওয়েল ছিল না।”
এখন ১৬০টি পরিবারে এই পাড়ায় একটি টিউবওয়েল এবং দুটি রিংওয়েল রয়েছে। রিংওয়েলের একটি পাড়াবাসী, অন্যটি বৌদ্ধ বিহারে ব্যবহারের জন্য। এখন থেকে রিংওয়েলের পানি উঠে কম। সকাল হলে আগেভাগে পানি নেওয়ার জন্য লাইন ধরে যায়। এক কলসি পানির জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে থাকতে হয়। সময় নষ্ট হয়। তার জন্য যে যার মত করে খালের পাশে গর্ত খুঁড়ে পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
সম্প্রতি আমতিল মারমা পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পাড়ার পাশেই বয়ে গেছে সুয়ালক খাল। খালের পাশে কয়েকজন নারী-পুরুষ গর্ত খুঁড়ে রাখা কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। তবে কেউ-ই ছাঁকনি ব্যবহার করছেন না। কুয়া থেকে সরাসরি মগ দিয়ে কলসিতে ভরছেন। পাশেই কেউ গোসল করছেন। কেউ কাপড় ধোয়ায় ব্যস্ত।
মায়ইচিং মারমা নামে এক নারী বলেন, “খাবার পানি যা সংগ্রহ করার দরকার সকালে করা শেষ। এখন কাজের শেষে গোসলের ফাঁকে এক কলসি পানি নিয়ে যাব। টিউবওয়েল থেকে হলে বেশি চাপতে হয়; পানিও কম পড়ে। টিউবওয়েলে এখন যতটুকু পাচ্ছি কয়েক দিন পর আরও কম পাওয়া যাবে।
“এরপর আর মোটেও পাওয়া যাবে না। মাঝে মাঝে বৌদ্ধ বিহারে রিংওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসি। ওই রিংওয়েল থেকেও আগের মত পানি উঠে না।”
কুয়ার পানি খেয়ে পানিবাহিত রোগ-বালাইয়ের শিকার হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বেশির ভাগ সময় কুয়ার পানিই তো খাওয়া হয়। ফুটিয়েও খাওয়া হয় না। বর্ষাকাল ছাড়া কুয়ার পানি একমাত্র ভরসা আমাদের। কোনো সময় রোগ-শোক হয়নি। এমনকি ডায়রিয়াও না। কুয়ার পানি খাওয়ায় অভ্যাস হয়ে গেছে।”
এ সময় পানি সংগ্রহ করতে আসা থুইম্রাচিং মারমা ও হ্লাম্রাচিং মারমা নামে আরও দুই নারী বলেন, বর্ষাকালে খালের পানি ঘোলা থাকে। গর্ত খুঁড়ে কুয়া করা যায় না। টিউবওয়েল ও রিংওয়েল থেকেও মোটামুটি পানি পাওয়া যায়। পানি সংগ্রহের এত চাপও থাকে না। তখন কেউ কেউ বৃষ্টির পানি জমিয়ে খায়। এই পাড়ার লোকজন সবাই এভাবে পানি খেয়ে থাকে।
‘কুয়ার পানি কতদিন খাব?’
কয়েক বছর আগে শুষ্ক মৌসুমে সুয়ালক খালের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গিয়েছিল। তখন গর্ত খুঁড়ে কুয়া করলেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যেত না। খালে গোসল করার মত পানিও থাকত না; যেটুকু থাকত, তাও ছিল ঘোলা- এমনটাই জানান পাড়ার আরেক বাসিন্দা সুইক্যসিং মারমা।
তিনি বলেন, “ওই সময় খালের উজানে পাথর উত্তোলন চলছিল। নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছিল। বড় বড় পাথর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভেঙে নিয়ে যাওয়া হত। এসব কার্যক্রমের কারণে পুরো সুয়ালক খালের পানি ঘোলা হয়ে থাকত। কুয়া খুঁড়ে কোনোমতে খাবার পানি সংগ্রহ করা গেলেও গোসল ও দৈনন্দিন কাজে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হত।
“বর্তমানে উজানে পাথর উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে, তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।”
তিনি বলেন, “জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ থেকে লোকজন এসে টিউবওয়েল বসিয়েছিল। সেগুলো থেকেও এক দেড় বছর পর পানি আর উঠে না। এসব নলকূপ দুই থেকে তিনশ ফুটের গভীরে যায় না। এ কারণে মনে হয় পানি উঠে না।

“এটা যদি হাজার ফুটের গভীরে পাইপ বসানো যায় তাহলে পানি পাওয়া যাবে। তাদেরকে বিষয়টি বলাও হয়েছিল। এভাবে গর্ত খুঁড়ে কুয়ার পানি আর কতদিন খাব।”
সুয়ালক ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুইক্যহ্লা মারমা বলেন, “আমতলি পাড়ায় বর্তমানে দুটি রিংওয়েল রয়েছে। আয়রন বেশি হওয়ায় পানি খাওয়ার উপযোগী না। কোনো রকমে ব্যবহার করা যায়। শুষ্ক মৌসুমে পানিও কম ওঠে।
“এবার রিংওয়েল বসালে ৬০০ ফুটের গভীরে যেতে হবে। তখন পানি পাওয়া যাবে। এতে কাজ না হলে বিকল্প উপায় হিসেবে খালের অন্য পাশে একট গভীর নলকূপ বসাতে হবে। এটার জন্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।”
সুয়ালক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উক্যনু মারমা বলেন, “এই এলাকায় নলকূপ দিয়ে পানি পাওয়া যায় না। এখানে রিংওয়েল বসাতে হবে। আমার ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মোট ১০টি রিংওয়েলের আবেদন করা হয়েছে।
“তার মধ্যে আমতলি মারমা পাড়ায় আরও দুটি রিংওয়েল স্থাপন করা হবে। এটা করা হয়ে গেলে পানি সংকট আর সেভাবে থাকবে না।”

কুয়ার পানি কতটুকু নিরাপদ
স্থানীয়রা বলছেন, কুয়ার পানি খেয়ে কোনো সময় রোগ-বালাইয়ের শিকার হননি। পানি সবসময় স্বচ্ছ ও পরিষ্কার থাকে। গরমকালে বেশ ঠাণ্ডা থাকে। আবার শীত মৌসুমে হালকা গরমের ভাপ থাকে। পানি সংগ্রহের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাকনি ব্যবহার করা হয় না।
তবে পানি ঘোলা বা অপরিষ্কার থাকলে তখন ছাকনি ব্যবহার করে থাকেন বলে জানান তারা।
কুয়ার পানি খাওয়া কতটুকু নিরাপদ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান সদর হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার দিলীপ চৌধুরী বলেন, “কুয়ার পানি সরাসরি খাওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ না। পাহাড়ে বিভিন্ন এলাকায় অনেকে হয়ত উপায় না পেয়ে কুয়ার পানি বাধ্য হয়ে খান। এক্ষেত্রে কুয়ার পানি সংগ্রহের সময় ছাকনি দিয়ে নিতে হবে। ঘরে নিয়ে আসার পর ফুটিয়ে খেতে হবে।”
সদর হাসপাতালে শহর এলাকা এবং উপজেলা থেকে আসা রোগীদের অধিকাংশ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত বলে জানান তিনি।
‘আনসাকসেসফুল জোন’ সুয়ালক
সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়ন এলাকাকে পানি সংকটের জন্য ‘আনসাকসেসফুল জোন’ বলে মন্তব্য করেছেন বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সুয়ালক এলাকায় দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়েও পানি সংকট দূর করা যাচ্ছে না। এই এলাকার কোনো জায়গায় পানি পাওয়া যায় না। এটা একটা ‘আনসাকসেসফুল জোন’।
“সেখানে কোনো এলাকায় টিউবওয়েলের কাজ হয় না। রিংওয়েল বসিয়ে পানি সংকট দূর করতে হবে। এলাকাবাসীরা রিংওয়েলের জন্য আবেদন করেছে। এগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে।”
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
পাহাড়ি এলাকায় পানি সংকটের কারণ বিষয়ে বান্দরবান মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও পানি বিভাজিকা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, “পাহাড়ে মাটি ও ভূমির গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। পানি স্তর খুব নিচে থাকে।
“পানির স্তরগুলো আবার পাথর ও কংক্রিটের ভরা থাকে। এ কারণে মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যেখানে যেরকম পদ্ধতি প্রয়োজন সেভাবেই পানির সংকট মেটাতে হবে।”
তিনি বলেন, “এ ছাড়া মাটির উপর স্তরে গাছ এবং পাথর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো থাকলে প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে। কিন্তু এই উৎসগুলোও দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে।”
-বিডি নিউজ ২৪।