১৩৯ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর: সক্ষমতা বাড়লেও কাটেনি অবকাঠামোগত সংকট

১৩৯ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর: সক্ষমতা বাড়লেও কাটেনি অবকাঠামোগত সংকট

১৩৯ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর: সক্ষমতা বাড়লেও কাটেনি অবকাঠামোগত সংকট
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর ১৩৯ বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় বন্দরের প্রবৃদ্ধি ও পরিধি বাড়লেও পুরানো অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির সংকটে এর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাত্র ৬টি কন্টেইনার দিয়ে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে বছরে ৩৩ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করছে। প্রতি বছর এখানে ভিড়ছে প্রায় ৪ হাজার দেশি-বিদেশি মাদার ভ্যাসেল। শনিবার (২৫ এপ্রিল) বন্দরটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ১৩৯তম বছর পালিত হচ্ছে।

ষোড়শ শতকে পর্তুগিজ বণিকেরা এই বন্দরের নাম দিয়েছিলেন ‘পোর্তে গ্র্যান্দো দি বেঙ্গলা’। অষ্টদশ শতকে ব্রিটিশদের কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘গ্র্যান্ড পোর্ট অব বেঙ্গল’ হিসেবে। কয়েকশ বছর আগে পণ্য আনা-নেয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আনুষ্ঠানিক বন্দরের স্বীকৃতি মেলে ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল। আর স্বাধীন বাংলাদেশে কন্টেইনার কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ২২ মার্চ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘যত পণ্য আমদানি-রফতানি হয় তার ৯৩ ভাগ সমুদ্রপথে আসছে এবং কন্টেইনারে যে সমস্ত কার্গো আসছে তার প্রায় ৯৮ ভাগ বাংলাদেশের এই চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমরা আনা-নেয়া করছি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং আমরা যদি এই টোটাল আমদানি-রফতানির হিসাব দেখি, আমাদের প্রবৃদ্ধির হিসাবটা দেখি, আমরা গত ২৫ বছরে যদি দেখি আমাদের আমদানি-রফতানি প্লাস কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যে ধারা পুরোটাই ঊর্ধ্ব সূচকে রয়েছে। এবং এখন এই ২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো প্রবৃদ্ধিটা সূচক ঊর্ধ্বমুখী রেখেছি এবং এই বৈশ্বিক যে সমস্যাটা এখন চলছে সেই সমস্যার মধ্যেও কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এবং ব্যবসাবান্ধব ও জনবান্ধব একটা পরিবেশ সৃষ্টি করার এখানে চেষ্টা করছে।’

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বন্দর দিয়ে ৪ থেকে ৫ লাখ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য আনা-নেয়া হচ্ছে। বছরে এখান থেকে রাজস্ব আদায় হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা। শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি রফতানির শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক।

বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘কুইক সার্ভিস দেয়া, টার্ন এরাউন্ড টাইমটা কমানো। এখন আমরা অ্যাভারেজে যখন স্বাভাবিক অবস্থা থাকে দুই-তিন দিন সময় লেগে যায়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের বড় বড় বন্দরগুলিতে দিনে দিনে মাল খালাস হচ্ছে। দুই-চার দিন, পাঁচ দিন যদি বন্দর বন্ধ থাকে এই বন্দরটাকে কিভাবে আমরা সমন্বয় করব? এরকম একটা কিছু থাকা উচিত। এই পর্যায়ে যাওয়ার জন্য বন্দরকে কাজ করতে হবে। কারণ এই দুই-তিন দিনও কিন্তু অনেক সময় আমরা মানে অ্যাফোর্ড করতে পারি না। আমি মনে করি বন্দরকে এখন মনোযোগী হওয়া উচিত যে টার্ন এরাউন্ড টাইমটা কিভাবে কমানো যায়, জাহাজের অপেক্ষা করার যে সময় সেটাকে কিভাবে কমানো যায়, বন্দরে খালাস করার যে একটা গতি সেটা কিভাবে বাড়ানো যায়, এ সমস্ত দিকে আমার মনে হয় নজর দেয়া উচিত।’

তৈরি পোশাক খাতের রফতানির শতভাগই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে, যার বার্ষিক আর্থিক পরিমাণ অন্তত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিজিএমইএ-র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী বলেন, ‘মোর দ্যান একশ বছরের পুরানো একটা বন্দর, সেই ক্ষেত্রে আমরা মনে হয় একটু পিছিয়ে আছি। বন্দরে আমরা এই মুহূর্তে ৮০ শতাংশ ব্যবহার করে থাকি আরএমজি সেক্টর। কিন্তু ওয়ান অব দ্য বিগেস্ট স্টেকহোল্ডার। এবং আমরা চাই বন্দরে যে সক্ষমতাটা আছে সেটা যাতে আরো বাড়ে এবং আরো গতিশীল হয়। আপনারা জানেন যে ইকুইপড, আমাদের যে কন্টেইনার আসে, আসার সেম ডে যাতে আমরা ডেলিভারি পাই। স্পেশালি ওয়ান স্টপ সার্ভিস যদি চালু করতে পারে, এ বন্দর সক্ষমতার অনেক বেড়ে যাবে এবং আমরা এখান থেকে অনেক অনেক সুবিধা পাব এবং বন্দরেরও অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে।’

বন্দরের আধুনিকায়নে চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নির্মিত হলেও অবহেলিত রয়ে গেছে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। বন্দরের ১৮টি কিউজি ক্রেনের সবকটিই সিসিটি ও এনসিটিতে কর্মরত।

জিসিবি’র আধুনিকায়ন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, ‘ছোটখাটো অনেক বিষয় আছে যেগুলি অনেক আধুনিকায়নের অনেক স্কোপ আছে কিন্তু সেগুলি হচ্ছে না। বেশি পরিমাণ শেড দরকার, ইয়ার্ডগুলিকে আরো সুন্দরভাবে সুবিন্যস্ত করতে হবে যেহেতু আমাদের ধারণক্ষমতা অনেক বাড়তে পারে। তারপর আপনার ইকুইপমেন্টের ক্ষেত্রে অনেক বৃদ্ধি করার দরকার আছে। যেগুলি, মন্ত্রণালয় যদি তড়িৎ সিদ্ধান্ত আসে, ইকুইপমেন্টের সংখ্যা বাড়ানো যাবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের যে কার্যক্রম সেটাকে অনেক স্মুথভাবে এগিয়ে নেয়ার একটা ব্যাপার-স্যাপার থাকবে।’

ব্রিটিশ ম্যাগাজিন লয়েড’স লিস্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থান ৬৮তম। কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং জাহাজ বার্থিংয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব বার্ষিক আয় বর্তমানে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *