পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপক্ষের গড়িমসির অভিযোগ কাজল তালুকদারের

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপক্ষের গড়িমসির অভিযোগ কাজল তালুকদারের

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপক্ষের গড়িমসির অভিযোগ কাজল তালুকদারের
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আওতায় জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনায় এখনো বড় ধরনের অসঙ্গতি ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। হস্তান্তরিত বিষয়গুলো নিয়ে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় জেলা পরিষদ তার প্রাপ্য কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাঙামাটি জেলা পরিষদের হলরুমে পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান।

May be an image of one or more people, dais and text

এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)-এর উপ-পরিচালক রওশন জাহান মনি, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা, সিএইচটি নারী হেডম্যান-কার্বারী নেটওয়ার্কের সভাপতি জয় ত্রিপুরাসহ তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন হেডম্যান ও কার্বারী নেতৃবৃন্দ।

বক্তব্যে কাজল তালুকদার বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে প্রায় ৩০টি বিষয় হস্তান্তর করা হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এসব হস্তান্তরিত বিষয় সংক্রান্ত এমওইউ ও চুক্তিপত্র বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তার মতে, অধিকাংশ চুক্তিই যথাযথভাবে সম্পাদিত হয়নি।

তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা চুক্তি যে ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে হয়েছে, সেগুলোর কোথাও না কোথাও ফাঁকি রয়েছে। যথাযথভাবে চুক্তিগুলো হয়নি। ফলে যেসব কর্মকর্তা হস্তান্তরিত বিভাগগুলোতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন, তারাও জেলা পরিষদকে যথাযথভাবে মান্য করেন না।”

তিনি আরও বলেন, পর্যটন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক কার্যক্রম এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত জেলা পরিষদের আওতাধীন হলেও বাস্তবে এসব খাতে পরিচালিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেলা পরিষদকে অনেক ক্ষেত্রে অবহিত করা হয় না।

কাজল তালুকদার বলেন, “তথাকথিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক একটি সংস্থা রয়েছে, সেটিও জেলা পরিষদের অধীনে। কিন্তু সেখানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাজ গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে, অথচ জেলা পরিষদ কিছুই জানে না। বিষয়টি আমি মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তুলে ধরেছি।”

May be an image of one or more people and table

তিনি জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে এডিবির অর্থায়নে প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু জেলা পরিষদকে সে সম্পর্কেও অবহিত করা হয়নি।

তার ভাষায়, “তাহলে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা এমওইউ দেখলেই বোঝা যায়। চুক্তি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপক্ষের গড়িমসি আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আজকে এটা হচ্ছে, কালকে ওটা হচ্ছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়গুলোকে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখা বা ঘুম পাড়িয়ে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রায় এক মাস সময় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, জেলা পরিষদ আইন এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইন গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। এসব আইনে জেলা পরিষদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়েই তিনি কাজ শুরু করেন।

তিনি বলেন, “আমি যদি জেলা পরিষদ আইন না বুঝতাম, আমি যদি শান্তি চুক্তি না বুঝতাম, তাহলে আজকে এসব বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রকাশ পেত।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন কাজল তালুকদার। তিনি বলেন, গত ১৮ মাস ধরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভায় অংশ নিতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিষয়ে অনেক কর্মকর্তা জেনেও না জানার ভান করছেন।

May be an image of one or more people, people studying, dais and text

তিনি বলেন, “যখনই মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যাই, মনে হয় যেন আমি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছি। সেখানে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবরা আছেন; কিন্তু তারা শান্তি চুক্তি জেনেও না জানার ভান করে থাকেন। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, “যদি তারা বাস্তবায়নের পক্ষে না থাকেন, তাহলে আমি বা অন্য কেউ যতই বলি না কেন, কোনো লাভ হবে না। কারণ যেকোনো প্রস্তাব, দাবি বা অধিকার আদায়ের বিষয় আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই উত্থাপন করতে হয়।”

শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম চালুর বিষয়ে নিজের অপূর্ণতার কথাও তুলে ধরেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই ১৮ মাসে আমি সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছি শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে। আপনারা জানেন, আমি সেখানে ব্যর্থ হয়েছি। আমার কাছে এটি বড় কষ্টের বিষয়। আমি হয়তো আর বেশিদিন এখানে থাকব না, দুই-একদিনের মধ্যে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম অন্তত শিক্ষক নিয়োগটা যদি করতে পারি, তাহলে অনেকটা সার্থক হতাম। কিন্তু যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটি অপূর্ণই থেকে গেল। এজন্য আমি সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”

সম্মেলনে বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, প্রথাগত শাসনব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, ভূমি অধিকার সংরক্ষণ এবং হেডম্যান-কার্বারীদের ভূমিকা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং হস্তান্তরিত বিষয়গুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *