ভারত-থাইল্যান্ড মহাসড়ক ঘিরে অভিযান জোরদার, বাণিজ্য করিডোর পুনর্দখলে জান্তার তৎপরতা
![]()
ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের নেপিদো সফরের মধ্যেই সীমান্ত করিডোরে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’, বাস্তুচ্যুত ৩০ হাজারের বেশি মানুষ
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের কৌশলগত সীমান্ত বাণিজ্য করিডোরগুলোতে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে দেশটির সামরিক সরকার। একই সময়ে নেপিদো সফরে এসে উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্প নিয়ে বৈঠক করেছেন ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত অভয় ঠাকুর।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ পুনর্দখল এবং বহুল আলোচিত ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই সামরিক সরকার সীমান্ত এলাকায় অভিযান জোরদার করেছে।
গত ৩০ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত ভারত সফরকালে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্প সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করেন। এ মহাসড়ক ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনের অন্যতম প্রধান করিডোর হিসেবে বিবেচিত।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সংঘাতের কারণে সাগাইং অঞ্চলের তামু এবং ভারতের মোরেহ সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ভারত সফরের সময় মিন অং হ্লাইং দাবি করেন, কালে-তামু সড়ক পুনরায় চালু এবং সীমান্ত বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সামরিক বাহিনী সম্প্রতি সীমান্তবর্তী খামপাট শহরের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখলের দাবি করেছে। শহরটি তামু ও কালের মধ্যকার উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্যপথের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত।
বর্তমানে সামরিক বাহিনী কালেওয়া থেকে সাগাইং অঞ্চলের রাজধানী মনিওয়া পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান সড়কে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। কালেওয়া শহরটি কালে থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পূর্বদিকে অবস্থিত।
ইনমাবিন জেলা পিপলস ডিফেন্স টিমের তথ্য অনুযায়ী, এ সামরিক অভিযানের ফলে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইনমাবিন ও পালে টাউনশিপে বহু গ্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং অন্তত ৪০ জন বাসিন্দাকে আটক করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিরোধ বাহিনীর এক সদস্য বলেন, পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা পালাতে পারছেন না, তাদের আটক করে হত্যা করা হচ্ছে।
এদিকে চলমান সামরিক অভিযান এবং বেসামরিক হতাহতের মধ্যেই গত ২৩ ও ২৪ জুন নেপিদোতে মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়ো সো, উচ্চকক্ষের স্পিকার অং লিন দ্বে, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগমন্ত্রী অং কিয়াও হো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. খিন নাইং উ এবং উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কো কো কিয়াওয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অভয় ঠাকুর।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ, রুপি-কিয়াতে সরাসরি লেনদেন ব্যবস্থা চালু, ব্যাংকিং সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে থাকা কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পসহ বিভিন্ন যৌথ উন্নয়ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া মিয়ানমারের শান্তি প্রক্রিয়ায় ভারতের সমর্থন এবং দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যদের সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত।
নেপিদোর বৈঠকের আগে গত ১৯ জুন রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তের কালাদান প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিত্তে বন্দরও পরিদর্শন করেন অভয় ঠাকুর।
ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কটি প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটি ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে তামু, কালেওয়া, মনিওয়া, মান্দালয়, নেপিদো, বাগো, হ্পা-আন এবং মিয়াওয়াডি হয়ে থাইল্যান্ডের মে সট পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে কালেওয়া-মনিওয়া অংশটি প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ইনমাবিন, কানি ও মিংগিন টাউনশিপের প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকা অতিক্রম করেছে।
সামরিক সরকার দাবি করেছে, তারা দ্রুত কালেওয়া-মনিওয়া সড়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ চাউংমা গ্রামে সেনারা অবস্থান করছে।
তবে প্রতিরোধ বাহিনী এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইনমাবিন পিডিএফের এক সদস্য বলেন, চাউংমা ছাড়া বাকি সব এলাকা এখনও প্রতিরোধ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সরকারি সেনারা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেই সংঘর্ষ শুরু হচ্ছে।
গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সামরিক সরকারের নির্বাচনে কানি ও মিংগিন টাউনশিপে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। ফলে এসব আসনে সামরিকপন্থী ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
যদিও গত ২০ জুন সামরিক সরকার খামপাট শহর পুনর্দখলের দাবি করেছে, প্রতিরোধ বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, পুরো সড়কপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি বাহিনী এখনও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, যদি সামরিক সরকার কালেওয়া-মনিওয়া এবং তামু-কালে—উভয় সড়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কৌশলগত অন্যান্য বাণিজ্য করিডোরেও সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক ও কালাদান প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।