দৃষ্টির আলো নেই, আছে স্বপ্ন: শ্রুতিলেখক সংকটে অনিশ্চয়তায় বান্দরবানের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইমতিয়াজুল
![]()
নিউজ ডেস্ক
আর মাত্র কয়েকদিন পর শুরু হবে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা। সারা দেশের লাখো শিক্ষার্থী যখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন বান্দরবানের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ প্রশ্নপত্র নয়, বরং পরীক্ষার হলে তার হয়ে উত্তর লিখে দেওয়ার জন্য একজন অনুমোদিত শ্রুতিলেখক (রাইটার) পাওয়া। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অদম্য অধ্যবসায় এবং একটি পরিবারের অগণিত ত্যাগ যেন এখন আটকে আছে একটি প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায়।
বান্দরবান পৌরসভার বাসিন্দা হাফেজ মো. ইমতিয়াজুল ইসলাম শুভ মাত্র ১১ মাস বয়সে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হয়ে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। শৈশব থেকেই পৃথিবীকে তিনি দেখেননি চোখে, কিন্তু জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কখনো হারিয়ে যায়নি। অন্ধত্বকে জীবনের শেষ পরিণতি হিসেবে মেনে না নিয়ে তিনি শিক্ষাকেই বেছে নিয়েছেন নিজের স্বপ্ন পূরণের পথ হিসেবে।

দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও শ্রবণশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং অদম্য মানসিক শক্তিকে পুঁজি করে তিনি নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। পরিবারের অক্লান্ত সহযোগিতা এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমে এবার তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে এমন একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা তার বহু বছরের সাধনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক ও মূল্যায়ন পরীক্ষা চলমান থাকায় প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতিলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত পরীক্ষার্থীর চেয়ে নিম্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীকে শ্রুতিলেখক হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে সম্ভাব্য অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজ নিজ পরীক্ষায় ব্যস্ত থাকায় ইমতিয়াজুলের জন্য কাউকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে পরিবার সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া একজন শিক্ষার্থীকে শ্রুতিলেখক হিসেবে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু ওই শিক্ষার্থীর ফলাফল এখনো প্রকাশ না হওয়ায় শিক্ষা বোর্ড তাকে অনুমোদন দেয়নি। ফলে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাননি তারা।
ইমতিয়াজুলের বাবা খায়রুল বশর, যিনি বান্দরবান পৌরসভার একজন খণ্ডকালীন গাড়িচালক, বলেন, সীমিত আয়ের সংসারে ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই ছিল বড় সংগ্রাম। তারপরও কখনো হাল ছাড়েননি। তিনি বলেন, “ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে অনেক কষ্ট করেছি। এখন শুধু একজন শ্রুতিলেখকের অনুমোদনের অভাবে যদি সে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে, তাহলে এত বছরের সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে। চারদিকে সবারই পরীক্ষা চলছে। এখন আমার সন্তানের জন্য কে নিজের পরীক্ষা বাদ দিয়ে শ্রুতিলেখক হবে? কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”

মা রোজি আক্তার বলেন, স্বামীর সীমিত আয়ে ছেলেকে উন্নত কোচিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষক দেওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না। তবুও তিনি প্রতিদিন নিজ হাতে ছেলেকে কলেজে নিয়ে গেছেন, যাতে কোনো ক্লাস মিস না হয়। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “প্রতিদিন ছেলেকে কলেজে নিয়ে যাওয়া, আবার বাসায় ফিরিয়ে আনা—এটাই ছিল আমার দায়িত্ব। কখনো ভাবিনি পরীক্ষার ঠিক আগে এসে এমন একটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। এখনো জানি না ছেলেটা পরীক্ষায় বসতে পারবে কি না। সরকারের কাছে আমার একটাই অনুরোধ—আইন ও নীতিমালা যেন মানুষের জন্য হয়। একটি মেধাবী সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন কেবল একটি প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নষ্ট না হয়।”
প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী জর্জ ত্রিপুরা মনে করেন, প্রচলিত নীতিমালার উদ্দেশ্য পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে অনেক সময় তা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করে। তিনি বলেন, “কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী যেন শুধু নীতিমালার সীমাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। শিক্ষা বোর্ডের উচিত দ্রুত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করা।”

শিক্ষাবিদদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও নমনীয় ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাকে শিক্ষার মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তাই এমন পরিস্থিতিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অসংখ্য শিক্ষার্থীর প্রতি রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতারও প্রতিফলন ঘটবে।
দৃষ্টির আলো হারিয়েও স্বপ্ন হারাননি ইমতিয়াজুল ইসলাম। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষা মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে আজ সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একজন অনুমোদিত শ্রুতিলেখকের অভাব। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি দ্রুত ও মানবিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করতে পারে—দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর তিনি পরীক্ষার হলে বসে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারবেন, নাকি প্রশাসনিক জটিলতার কাছে থেমে যাবে তার শিক্ষা-যাত্রা।
প্রসঙ্গত, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সমঅধিকারভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে মানবিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।