পাহাড়ে সরকারের দেয়া কোটি কোটি টাকার খাদ্যশস্য ও নগদ বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?

পাহাড়ে সরকারের দেয়া কোটি কোটি টাকার খাদ্যশস্য ও নগদ বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?

পাহাড়ে সরকারের দেয়া কোটি কোটি টাকার খাদ্যশস্য ও নগদ বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল ডেস্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন পার্বত্য জেলার ত্রাণ কার্য (খাদ্যশস্য ও নগদ) বরাদ্দের এক চাঞ্চল্যকর সরকারি চিঠি সাউথইস্ট এশিয়া জার্নালের হাতে এসেছে। ‘বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ছাড়কৃত ত্রাণ কার্য নগদ টি. আর (খাদ্যশস্য: চাল ও গম) এবং ত্রাণ কার্য নগদ (জি আর) এর মাস্টাররোল প্রেরণ সংক্রান্ত’ শিরোনামে আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, তিন জেলা প্রশাসক ও ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী টাস্কফোর্সসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠির মাধ্যমে গত অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকারের দেয়া বরাদ্দের চিত্র উঠে এসেছে।

চিঠিতে দেখা যাচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী পুনর্বাসন টাস্কফোর্স, উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয় পরিবারের গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জনসংহতি সমিতি-জেএসএসের তালিকাভুক্ত সদস্যদের খাদ্য পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় হাজার হাজার মেট্রিক টন চাল-গম ও কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এই বিপুল বরাদ্দের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো আশানুরূপ ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠি শেয়ার করে নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন, প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রামের নামে যে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয় সেই অর্থ দুর্যোগের সময় কোথায় যায়?

প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন খাতে মোট ৮৩,৬০০ মেট্রিক টন চাল ও গম এবং আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় নগদ ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যার মধ্যে ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য টাস্কফোর্সকে ১৫,৫১৪.২৬৯ মেট্রিক টন চাল এবং ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এই ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীরা আসলে কারা, এই বরাদ্দের প্রকৃত উপকারভোগী কারা, তারা কি আসলেই এই সহায়তা পাচ্ছে নাকি তা অন্যদের পকেটে যাচ্ছে?

একইভাবে প্রশ্ন উঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে ঘিরেও। যুগের পর যুগ ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার কার্যালয়ের জন্য প্রতিবছর যে, ১,৩৭৫ মেট্রিক টন চাল এবং ৫০ লক্ষ টাকা সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়?

ফেসবুক জুড়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, এই সহায়তা কি জনগণের জন্য নাকি সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব অর্থ গোপনে বিদেশে সন্তু লারমা তার পরিবার-পরিজনের কাছে পাঠাচ্ছেন? সাম্প্রতিক সময়ের সৃষ্ট বন্যা এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সন্তু লারমার আঞ্চলিক পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বছরের পর বছর ধরে বরাদ্দকৃত অর্থ এবং খাদ্যশস্য কিভাবে ব্যয় করা হয়েছে, সরকারি ভাবে কখনোই তার জবাবদিহিতা চাওয়া হয়নি কিংবা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

গত ৭ জুলাই প্রকাশিত ওই নথি অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আওতায় কথিত আত্নসমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের খাদ্য পুনর্বাসন কর্মসূচির নামে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ২,৩৫৯.৮০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়, যা প্রতি অর্থবছরেই প্রায় সমান। এ নিয়েও আছে ব্যাপক সমালোচনা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গবেষণা করেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা হয় সাউথ ইস্ট এশিয়া জার্নালের। তারা জানান, ১৯৯৭ সালে চুক্তির সময়ে কিছু ভাঙাচোরা অস্ত্র জমা দিলেও আদতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেনি। গত প্রায় ৩০ বছর ধরেই জেএসএস তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সুতরাং সরকারের সাথে প্রতারণা করে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করেও যুগের পর যুগ সরকারি সুযোগ সুবিধা গ্রহন করে যাচ্ছেন এসব সশস্ত্র জেএসএস সদস্যরা।

সচেতন মহলের মতে, এগুলো কোনো ঢালাও অভিযোগ নয়; বরং জনগণের করের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রশ্ন।

একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিভিন্ন সময়ে জেলা পরিষদের নামে সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত খাদ্যশস্য উত্তোলনের সময় স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি কর্তৃক টন প্রতি জেলা পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট একটা অংকের টাকা প্রদান করতে হতো। বিগত অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা কর্তৃক ব্যক্তি বিশেষের নামে প্রকল্পের নাম দিয়ে খাদ্য শস্য/ নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে যেসব প্রকল্পের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ে সরকারের দেয়া কোটি কোটি টাকার খাদ্যশস্য ও নগদ বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?
মন্ত্রণালয়ের দেয়া আপদকালীন বরাদ্দের তালিকা

এছাড়া, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মনোঘর এনজিওর নামে বিভিন্ন সময়ে খাদ্যশস্য এবং নগদ অর্থ থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অপরদিকে, বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ আর্থিক/ খাদ্যশস্য প্রদানের জন্য আবেদন করলেও কাঙ্ক্ষিত সাহায্য পায়নি এবং যতটুকু পেয়েছিল তা পেতে অনেক হয়রানির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সময় পাহাড়ে কফি চাষ, কাজু বাদাম চাষের নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ নয়-ছয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে অর্থাৎ চলতি বছরের জুন মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালও বিষয়গুলো উষ্মা প্রকাশ করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রদায়ের অন্তত ১৫ জন সাধারণ নাগরিকের সাথে কথা বলেছে সাউথইস্ট এশিয়া জার্নাল। তাদের সকলের কাছেই প্রায় কাছাকাছি প্রশ্ন ছিলো। উত্তরে তারা বলছেন, তিন জেলার জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের শীর্ষ মহলের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর এই বিশাল বরাদ্দ সাধারণ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এমনকি উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনের নেতা কিংবা প্রভাবশালী শীর্ষনেতারা সরকারের কোটি কোটি টাকার তহবিল এবং রেশনের অর্থ তছরুপ করে নিজেদের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও সন্তানদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে ব্যয় করছেন।

বাঘাইছড়ি উপজেলার রুপকারী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক এক ইউপি সদস্য, যিনি চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারনে প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন; তিনি জানান, সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজার-হাজার মানুষ চরম মানবিক সংকটে, তখন মাঠে নেমে একমাত্র সেনাবাহিনীসহ জেলা প্রশাসনকেই ত্রাণ দিতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদ কিংবা অন্য কোন পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ বা সাহায্য সহযোগিতা সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।

প্রশ্ন উঠছে, প্রাকৃতিক দূযোগ কিংবা সংকটকালীন সময়ে সরকারের দেয়া বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ ও অর্থ যাচ্ছে কোথায়?

মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠির সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য শান্তি ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বিতরণের জন্য ২৪ পদাতিক ডিভিশনকে মাত্র ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং ৮ হাজার মেট্রিক টন গম বরাদ্ধ দেয়া হয়। বছর জুড়ে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের আওতাধীন ৪টি রিজিয়নের অধীন প্রতিটি জোন ও ক্যাম্প, বিজিবির প্রতিটি ব্যাটালিয়ন ও বিওপির মাধ্যমে এসব সহায়তা হতদরিদ্র, পিছিয়ে পড়া ও দুস্থ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। যা স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যম সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীয়মান।

শুধু তাই নয়, সংকটকালীন সময়ে মহাসংকটের অক্সিজেন হিসেবে পাহাড়বাসীর পাশে দাঁড়াচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। সরকারি বরাদ্দের বাইরে নিজেদের জন্য ইস্যুকৃত রেশনের চাল, ডাল, তেল, চিনি, ঔষধ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিপদে ঝাপিয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত আজ দৃশ্যমান।

পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সাধারণ জনগনের প্রশ্ন, সরকারের পক্ষ হতে আপদকালীন যেসব বরাদ্দ বছরের পর বছর আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, টাস্কফোর্স কিংবা জেলা প্রশাসকদের দেওয়া হচ্ছে, তার সুফল যদি প্রান্তিক মানুষ না-ই পায়, তবে এই বিশাল বরাদ্দের ভার কেন এমন কোন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে না যারা মহৎ উদ্দেশ্যে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি ও বাঙালিদের উন্নয়নে কাজ করে?

কেউ কেউ দাবি করছেন, গত অর্থ বছরের এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ও ৯ কোটি টাকার যথাযথভাবে বন্টন এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করলে তার সচ্ছতা দৃশ্যমান থাকতো, আর সংকটকালে মানুষকে হাহাকার করতে হতো না। আর পার্বত্য এলাকায় এসব কাজে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান বা বাহিনী কোনটি তা কারো অজানা নয়।

সর্বোপরি, প্রতিটি অর্থবছরে পাহাড়ের মানুষের জন্য সরকারের দেয়া এসব প্রকল্প কিংবা আপদকালীন বরাদ্দের সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। এছাড়া পাহাড়ের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে ভবিষ্যৎ ত্রাণ ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরাসরি কোন নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এবং যথাযথ তদারকি করে সাধারণ পাহাড়িদের সুফল পাওয়ার পথ সুগম করা হোক- এমনটাই প্রত্যাশা পার্বত্যবাসীর।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *