হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট (জলকপাট) খুলে দেওয়া হয়েছে। শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল থেকে গেটগুলো খুলে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশন করা হচ্ছে।
বাঁধের জলকপাট খুলে দেওয়ার পর প্রবল বেগে পানি কর্ণফুলী নদীতে আছড়ে পড়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে সকাল থেকেই কাপ্তাই বাঁধ এলাকায় ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা। তবে দৃশ্য উপভোগের পাশাপাশি ভাটির এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টিপাত এবং পার্বত্য উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকে। এতে হ্রদের আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্পিলওয়ের ১৬টি গেট খুলে পানি নিষ্কাশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য টারবাইনের মাধ্যমে পানি ছাড়ার পাশাপাশি স্পিলওয়ের গেট দিয়েও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এর ফলে হ্রদের পানির উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে এবং বাঁধের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।
১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত কাপ্তাই বাঁধ দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বর্ষা মৌসুমে উজানের পানি ও বৃষ্টির পানি হ্রদে সংরক্ষণ করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তাই হ্রদের পানির উচ্চতা নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বাঁধের নিরাপত্তা—উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জলকপাট দিয়ে প্রবল বেগে পানি বের হওয়ার দৃশ্য দেখতে বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। একই সঙ্গে সময়মতো পানি ছাড়ার সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নাছের খান বলেন, গত বছর আমার দোকানে পানি ঢোকার পর বাঁধের গেট খোলা হয়েছিল। এবার আগে থেকেই পানি ছাড়ার কারণে আমরা অনেকটা স্বস্তিতে আছি। আশা করছি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যাবে।
কাপ্তাই নতুন বাজারের ব্যবসায়ী মো. আকরাম হোসেন বলেন, বর্ষা এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। তবে এবার আগেভাগে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত খুবই ভালো হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান বলেন, টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত হ্রদের পানি ১০৭ ফুট এমএসএল স্পর্শ করলে পানি ছাড়ার প্রয়োজন হয়। তবে চলমান বন্যা পরিস্থিতি এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় এনে এবার আগেভাগেই, প্রায় ১০৫ ফুট এমএসএল উচ্চতায় পৌঁছানোর পর স্পিলওয়ের গেট খুলে পানি নিষ্কাশন শুরু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হ্রদের পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অতিরিক্ত পানি জমে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি কমানো। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বৃষ্টিপাত ও পানির প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশনের পরিমাণ সমন্বয় করা হবে।
উল্লেখ্য, কাপ্তাই বাঁধ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হওয়ায় এর পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও বন্যা পরিস্থিতিতে আগাম পানি নিষ্কাশনের সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে। তবে স্পিলওয়ের গেট খুলে দেওয়ার ফলে কর্ণফুলী নদীর ভাটির এলাকায় পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে কাপ্তাই হ্রদের পানি ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিক ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।