রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের নতুন পথ: মানবিকতা থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব
![]()
ড. সরদার আলী হায়দার
রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০১৭ সালে যে সংকটকে আমরা মূলত মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখেছিলাম, আজ সেটি শুধু মানবিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রশ্নকে আগের ভাষায় ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে।
বাংলাদেশ নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে একটি নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছিল। সেই সিদ্ধান্ত ছিল মানবিক, সাহসী এবং আন্তর্জাতিক আইনের চেতনাসম্মত। বিশ্ব সম্প্রদায়ও বাংলাদেশের এই ভূমিকার প্রশংসা করেছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে একটি অস্থায়ী মানবিক উদ্যোগকে অনির্দিষ্টকাল ধরে বহন করা সম্ভব নয়। সময় যত গড়িয়েছে, কক্সবাজারের শিবিরগুলো ততই একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ২০২১ সাল থেকে তাদের একটি অংশকে ভাসান চরে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবু সংকটের মূল চরিত্র বদলায়নি-প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে একই সংকট বহন করতে করতে একটি রাষ্ট্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে। স্থানীয় জনগণের ওপর চাপ বাড়ে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে শুরু করে, আর সংকট ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, পৃথিবী যখন একটি সংকটকে দীর্ঘদিন ধরে দেখে, তখন সেটি নিয়ে তার আগ্রহও কমে যায়। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও সেই লক্ষণ এখন স্পষ্ট।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমটি হলো আগের মতোই আন্তর্জাতিক সহানুভূতির ওপর নির্ভর করা এবং প্রতি বছর একই ভাষায় আরও সহায়তার আবেদন জানানো। দ্বিতীয় পথটি অনেক কঠিন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। সেটি হলো রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক বোঝা হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করা। অর্থাৎ এমনভাবে বিষয়টি তুলে ধরা, যাতে এই সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশের প্রয়োজন নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বড় শক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে প্রতীয়মান হয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি সহজ সত্য হলো রাষ্ট্রগুলো নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় স্বার্থের ভিত্তিতে। মানবিকতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একা সেটি কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে না। চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারত প্রতিটি দেশই রোহিঙ্গা সংকটকে নিজেদের কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে। ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাষাও বদলাতে হবে। শুধু মানবিক আবেদন নয়, বরং এই সংকট কীভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে, সেটিও তুলে ধরতে হবে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় রাখাইনে। কয়েক বছর আগেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা মূলত নেপিদোর সামরিক সরকারের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ সেই সমীকরণ বদলে গেছে। আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় একটি কার্যকর সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। Council on Foreign Relations-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে মংডুর নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে যাওয়ার পর উত্তর রাখাইনের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে কোনো পক্ষকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবল পুরোনো কাঠামোয় আলোচনা চালিয়ে গেলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যেতে পারে।
এর পাশাপাশি কক্সবাজারের শিবিরগুলোও নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, পাহাড় কেটে বসতি, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব মিলিয়ে এগুলো এখন একটি পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, সময় যত যাচ্ছে, এই সংকটের মানবিক মূল্য ততই বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আর্থিক ব্যয়, প্রশাসনিক চাপ এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলে এই ব্যয় শুধু বাংলাদেশের একার নয়; পুরো অঞ্চলের জন্যই তা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে।
এই কারণেই এখন আলোচনার ভাষা বদলানো জরুরি। বাংলাদেশ যদি শুধু বলে যে রোহিঙ্গারা আমাদের ওপর বোঝা, তাহলে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন হবে। বরং বাংলাদেশকে এমন একটি ধারণা সামনে আনতে হবে, যাকে বলা যেতে পারে Rakhine Stability Compact। এর মূল বক্তব্য খুবই সরল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন শুধু একটি মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি রাখাইনের স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগেরও পূর্বশর্ত।
এই জায়গায় চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনকে চীন মূলত মানবাধিকার প্রশ্ন হিসেবে দেখে না। তাদের দৃষ্টিতে রাখাইন হলো কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি করিডর, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। অর্থাৎ চীনের অগ্রাধিকার হলো স্থিতিশীলতা। এই বাস্তবতাকে বাংলাদেশের বিপক্ষে নয়, বরং পক্ষে কাজে লাগানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের উচিত চীনের সঙ্গে আলোচনায় মানবিক আবেগের চেয়ে বাস্তব কৌশলের ভাষা ব্যবহার করা। সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হতে পারে রাখাইনে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা থাকলে চীনের বিনিয়োগও ঝুঁকির বাইরে থাকবে না। যে অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতি, সংঘাত এবং অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকে, সেখানে কোনো করিডরই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ হতে পারে না। নিরাপদ বন্দর, স্থিতিশীল করিডর এবং সফল কানেকটিভিটির জন্য একটি শান্ত ও স্থিতিশীল রাখাইন অপরিহার্য।
২০২৬ সালের বাংলাদেশ–চীন যৌথ ঘোষণায় রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বিষয়ে একটি “পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান” খুঁজে বের করার কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক ইঙ্গিত, কিন্তু এখানেই আলোচনা শেষ হওয়া উচিত নয়। এখন প্রয়োজন এই নীতিগত অবস্থানকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়া। চীন শুধু মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং রাখাইনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বাংলাদেশের মূল বার্তাটি তাই হতে পারে খুবই সরল, ‘একটি স্থিতিশীল রাখাইন বিশ্বাসযোগ্য রোহিঙ্গা সমাধান ছাড়া সম্ভব নয়’। এই বার্তি শুধু মানবিক আবেদন নয়; এটি চীনের নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানেই বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক ভাষার শক্তি। সংকটকে শুধু বোঝা হিসেবে তুলে ধরা নয়, বরং দেখানো যে এর সমাধান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সবারই প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকটের এই নতুন ভাষা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এই কৌশল তখনই সফল হবে, যখন বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একই ভাষায় নয়, বরং তাদের স্বার্থ বুঝে আলাদা আলাদা কূটনৈতিক ভাষায় কথা বলা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ক্ষেত্রে সেই ভাষা ভিন্ন হবে। ওয়াশিংটনের কাছে রোহিঙ্গা সংকট মূলত মানবাধিকার, গণহত্যা প্রতিরোধ, জবাবদিহি, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। তাই শুধু অতিরিক্ত ত্রাণ সহায়তার আবেদন করে বাংলাদেশের খুব বেশি লাভ হবে না। প্রয়োজন সম্পর্ককে একটি দীর্ঘমেয়াদি Strategic Humanitarian Partnership-এ উন্নীত করা।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বলতে পারে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের মানবিক বোঝা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত মূল্যবোধেরও পরীক্ষা। যদি মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্থিতিশীলতা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটকে শুধু বার্ষিক সহায়তা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
এই অংশীদারিত্বের ভিত্তি হতে পারে কয়েকটি বাস্তব উদ্যোগ। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মানবপাচার প্রতিরোধ, হোস্ট কমিউনিটির জন্য আলাদা সহায়তা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সীমিত তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির ধারাবাহিক সমর্থন, এসবই হতে পারে একটি বিস্তৃত সহযোগিতা কাঠামোর অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরা। কারণ সংকট যত দীর্ঘ হবে, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং সীমান্ত অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও তত বাড়বে। এই বাস্তবতায় মানবিক সহায়তা কেবল দয়া নয়; এটি ভবিষ্যতের বড় নিরাপত্তা সংকট প্রতিরোধে একটি বিনিয়োগ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি। রোহিঙ্গা সংকটকে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র বানানো বাংলাদেশের স্বার্থে নয়। বাংলাদেশ যদি একতরফাভাবে কোনো একটি শক্তির কৌশলগত ভাষা গ্রহণ করে, তাহলে অন্য পক্ষের আস্থা কমে যেতে পারে। আবার কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত করবে।
তাই বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত issue-based alignment। অর্থাৎ কোনো শক্তির বলয়ে যুক্ত হওয়া নয়; বরং প্রতিটি ইস্যুতে জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী অংশীদার নির্বাচন করা। যেখানে চীনের ভূমিকা প্রয়োজন, সেখানে চীনের সঙ্গে কাজ করা হবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নেওয়া হবে। একইভাবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতাও গড়ে উঠবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর।

ভারতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তববাদী হওয়া প্রয়োজন। ভারত রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের মতো মানবিক প্রশ্ন হিসেবে দেখে না। তাদের কাছে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রকল্প, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মাদক প্রবাহ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নিরাপত্তা ইস্যু।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বার্তা হতে পারে, রাখাইনের অস্থিতিশীলতা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এর প্রভাব মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা এবং সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতেও পৌঁছাতে পারে। সীমান্ত অপরাধ, অস্ত্র ও মাদকের প্রবাহ কিংবা নতুন বাস্তুচ্যুতি এসব কোনো দেশের সীমান্ত মেনে চলে না।
এই কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি Eastern Border Stability Dialogue শুরু করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। কক্সবাজার, বান্দরবান, নাফ নদী, রাখাইন, চিন, মিজোরাম, মণিপুর ও ত্রিপুরাকে একটি সংযুক্ত নিরাপত্তা-ভূগোল হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ উভয় দেশের জন্যই উপকারী হতে পারে। আলোচনার বিষয় হতে পারে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবপাচার, মাদক, কালাদান প্রকল্প, আরাকান আর্মির উত্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ।
বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনীতি গড়ে তুলতে হলে বাংলাদেশের নিজের প্রস্তুতিও শক্তিশালী হতে হবে। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন একটি স্থায়ী National Rohingya and Rakhine Strategy Cell। বর্তমানে রোহিঙ্গা সংকট শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, সীমান্ত প্রশাসন, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে সমানভাবে জড়িত। তাই একটি সমন্বিত নীতিনির্ধারণী কাঠামো সময়ের দাবি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। প্রত্যাবাসন নিয়ে যে কোনো আলোচনায় রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত থাকলে সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনো উগ্র বা সহিংস গোষ্ঠী নয়, বরং শিক্ষিত, শান্তিপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরাই আন্তর্জাতিক আলোচনায় পরোক্ষভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের একটি স্পষ্ট no-proxy policy থাকা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের কোনো আঞ্চলিক শক্তি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রক্সি রাজনীতির অংশ হতে দেওয়া যাবে না। এতে যেমন প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার তার ভূখণ্ড কোনো ধরনের সশস্ত্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হবে না।
এই আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায় ‘হোস্ট কমিউনিটি’। প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় মানুষ এই সংকটের সবচেয়ে বড় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ বহন করে আসছেন। তাদের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য আলাদা কর্মসূচি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। রোহিঙ্গাদের সহায়তার পাশাপাশি হোস্ট কমিউনিটির জন্য সমান গুরুত্ব দেওয়া এখন শুধু উন্নয়ন নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ।
সবশেষে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ কখনোই কোনো দেশের কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করা উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট থেকে উদ্ভূত বাস্তব চাপকে এমন একটি কূটনৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করা, যা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করে। এটি দুর্ভোগের ব্যবহার নয়; বরং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান।
বাংলাদেশের সামনে এখন সত্যিই দুটি পথ রয়েছে। একটি পথ হলো প্রতি বছর একই আবেদন পুনরাবৃত্তি করা, আন্তর্জাতিক সহানুভূতির অপেক্ষায় থাকা এবং প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়া। অন্য পথটি হলো সংকটকে নতুনভাবে দেখা- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং যৌথ স্বার্থের আলোকে।
দ্বিতীয় পথটি সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, সফল কূটনীতি শুধু নৈতিক অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তা দাঁড়িয়ে থাকে নৈতিকতা ও জাতীয় স্বার্থের বিচক্ষণ সমন্বয়ের ওপর।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এবং এখনও আছে তার মানবিক অবস্থান। এখন প্রয়োজন সেই মানবিক শক্তিকে কৌশলগত প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ কৌশলহীন মানবিকতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু মানবিকতার সঙ্গে যদি সুপরিকল্পিত কূটনীতি, বাস্তববাদী চিন্তা এবং জাতীয় স্বার্থের স্পষ্ট রূপরেখা যুক্ত হয়, তাহলে একই সংকট নতুন সম্ভাবনারও পথ খুলে দিতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এক দিনে আসবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি মানবিকতা ও কৌশল-এই দুইকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে পারে, তাহলে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা শুধু সংকটের ভার বহন করব না; সংকটের সমাধান তৈরির আলোচনাতেও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করব। সেটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের বাংলাদেশের কূটনৈতিক লক্ষ্য।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।