ছয় মাস ধরে স্থবির সেন্টমার্টিন, বাড়ছে জীবিকার সংকট-নিরাপত্তা শঙ্কা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”
![]()
কক্সবাজার প্রতিনিধি
সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে ছয় মাস ধরে কার্যত স্থবির হয়ে আছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের পর্যটন শিল্প। পর্যটকশূন্য দ্বীপে হোটেল-রিসোর্ট, নৌযান, অটোরিকশাসহ পর্যটননির্ভর অধিকাংশ ব্যবসা বন্ধ থাকায় জীবিকা সংকটে পড়েছেন হাজারো মানুষ। অন্যদিকে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলেও মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জেলেরা।
সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় মাছ ধরাই ছিল দ্বীপবাসীর প্রধান পেশা। পরে পর্যটন শিল্পের বিকাশের সঙ্গে স্থানীয়রা হোটেল-রিসোর্ট, নৌযান, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবসায় যুক্ত হয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন। কিন্তু পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে বছরে মাত্র ডিসেম্বর ও জানুয়ারি এই দুই মাস পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচনের আগে অনেক আশ্বাস দেওয়া হলেও নির্বাচনের পর কেউ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেননি। শুধু বৈঠক হচ্ছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।”
তবে পরিবেশবিদ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, পর্যটকের চাপ কমে যাওয়ায় দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সেন্টমার্টিন রক্ষায় এ উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।
ফুরিয়ে গেছে সঞ্চয়
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনেও প্রশাসনের আগাম অনুমতি প্রয়োজন হচ্ছে। পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অধিকাংশ পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। অনেকে জীবিকার সন্ধানে মূল ভূখণ্ডে চলে যাচ্ছেন।
হোটেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জিয়াউল হক জিয়া বলেন, “বছরের মাত্র দুই মাসের আয়ে ১০ মাস চলা সম্ভব নয়। ব্যাংক ঋণও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ত্রাণ চাই না, ব্যবসা করার সুযোগ চাই।”

দ্বীপ ছেড়ে টেকনাফে অটোরিকশা চালাচ্ছেন জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, “সেন্টমার্টিনে এখন কাজ নেই। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে টেকনাফে চলে এসেছি।”
সেন্টমার্টিন অটোরিকশা লাইনম্যান মো. হামিদ জানান, দ্বীপের দুই শতাধিক অটোরিকশাই এখন অলস পড়ে আছে।
শিক্ষার্থী জাবেদ ইকবাল বলেন, “দ্বীপের বাইরে পড়াশোনা করা শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার চরম সংকটে পড়েছে।”
সেন্টমার্টিন যাত্রী পরিবহন সার্ভিস বোট মালিক সমিতির সভাপতি রশিদ আহমদ বলেন, “টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে অনুমোদিত ২৭টি ট্রলারের মধ্যে বর্তমানে নিয়মিত চলাচল করছে মাত্র দুটি। ফলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।”

আরাকান আর্মির আতঙ্কে জেলেরা
স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারি তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যা ৭৯৯ হলেও বাস্তবে হাজারো পরিবার মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সীমান্তবর্তী সাগরে আরাকান আর্মির তৎপরতার কারণে অনেকেই গভীর সমুদ্রে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
জেলে আবদুর রহিম বলেন, “গভীর সমুদ্রে গেলেই আরাকান আর্মির সদস্যরা ধাওয়া করে। অনেক সময় জাল, ট্রলার এমনকি জেলেদেরও ধরে নিয়ে যায়।”
ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “গত এক বছরে বহু বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ করেছে আরাকান আর্মি। ইতোমধ্যে ২৮ জন ফিরে এলেও এখনো আটজন বন্দি রয়েছেন। এতে জেলে পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে।”
দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত সেন্টমার্টিন মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, দ্বীপের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। এক হাজার ৪৪৫টি পরিবারের মোট জনসংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৫ জন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বীপে উন্নত চিকিৎসাসেবারও সংকট রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নৌপথ উত্তাল থাকায় জরুরি রোগীদের মূল ভূখণ্ডে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এখনো সেখানে কোনো সি-অ্যাম্বুলেন্স চালু হয়নি।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, “টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে সি-অ্যাম্বুলেন্স চালুর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাজেট অনুমোদন পেলেই সেবা চালু করা হবে।”
সহায়তা নিয়ে অভিযোগ
পরিবেশ অধিদপ্তর ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, “গত এক বছরে ৫০০ পরিবারকে ১১ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।” তবে ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামের দাবি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুত সহায়তা এখনো অধিকাংশ পরিবার পায়নি।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, “প্রকল্পের বিষয়ে অবহিতকরণ সভা হয়েছে। শিগগিরই দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক সহায়তা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে সেন্টমার্টিনে রাতের বেলায় সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চশব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ, কেয়াবনে প্রবেশ, প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি এবং সৈকতে মোটরযান চলাচল নিষিদ্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।