পার্বত্য চট্টগ্রামে সমঅধিকার, আয়কর মওকুফ ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবিতে শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি দমনে কঠোর ব্যবস্থা, স্থায়ী বাঙালিদের আয়কর মওকুফ, সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারসহ ১১ দফা দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে ‘মাতৃভূমির সুরক্ষা’ স্লোগানে শাহবাগ চত্বরে এ কর্মসূচির আয়োজন করে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ। বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া সমাবেশে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত অংশগ্রহণকারীরা ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল জনগোষ্ঠীর সমান সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব এবং প্রধান বক্তা হিসেবে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও ভারী বৃষ্টির কারণে তারা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি বলে আয়োজকরা জানান।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা যে দাবিগুলো তুলে ধরেন, তার মধ্যে রয়েছে—
- পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা।
- পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর অভিযান পরিচালনা।
- পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে আয়কর মওকুফের আওতায় আনা।
- জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফসহ সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
- পার্বত্য এলাকায় সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি, একটি মাউন্টেন ডিভিশন ও একটি বিমানবন্দর স্থাপন।
- ‘এক দেশ, এক আইন’ নীতির ভিত্তিতে পাহাড় ও সমতলে সমান সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা।
- গণমাধ্যম ও সরকারি দপ্তরে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে সরকারের প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণের দাবি।
সমাবেশে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আয়কর সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যাপত্র উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত রাখার বিধান যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে আয়কর আইন, ২০২৩-এও সেই বিধান বহাল রাখা হয়।
তারা উল্লেখ করেন, চলতি বছরের অর্থবিলে প্রথমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বেতন ও আর্থিক সম্পদ থেকে অর্জিত আয় করযোগ্য করার প্রস্তাব থাকলেও পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যবসা, কৃষি ও বেতন আয় করমুক্ত রাখার বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
আয়োজকদের দাবি, এই সিদ্ধান্তের পর পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আয়কর অব্যাহতির দাবি জোরালো হয়। তাদের ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু বাঙালি পরিবার এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে এবং তাদের একটি বড় অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছে। তাই সমঅধিকারের নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় বাঙালিদেরও আয়কর মওকুফের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে করমুক্ত সুবিধা বহাল থাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও চাকরিজীবীরা নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করলেও সমপর্যায়ের সুবিধা পাচ্ছেন না।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পার্বত্য জেলার বাঙালি ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত করের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। অন্যদিকে করমুক্ত সুবিধা পাওয়া ঠিকাদারেরা তুলনামূলক কম দরপত্র দিতে সক্ষম হওয়ায় প্রতিযোগিতায় অসম পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
আয়োজকদের উপস্থাপিত তথ্যে দাবি করা হয়, পার্বত্য তিন জেলায় করযোগ্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে একাধিক ব্যক্তি উচ্চ আয়ের পর্যায়ে রয়েছেন এবং এ সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। একই সময়ে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও গুচ্ছগ্রামে বা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জীবনযাপন করছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা ও চাকরিতে বিশেষ সুবিধা এবং নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। তবে তাদের দাবি, পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতা দমন, স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সমঅধিকারের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
সমাবেশ শেষে আয়োজকরা সরকারের প্রতি তাদের ১১ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এবং দাবি পূরণ না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার ইঙ্গিত দেন।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনটি সমাবেশে আয়োজকদের উপস্থাপিত বক্তব্য, দাবি ও তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। উত্থাপিত অভিযোগ ও পরিসংখ্যানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত নয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।