পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?

পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?

পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবি কেন—আঞ্চলিক সংগঠন, গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের ভিন্নমত

বিশেষ প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি

পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমমর্যাদায় বসবাস করছে অন্তত ৪৫ টি নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানেও স্বীকৃত। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বিভিন্ন ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের’ অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

এসব নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর বৃহৎ একটি অংশ বসবাস করছে দেশের এক দশমাংশ অঞ্চল জুড়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে এসব জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সাংবিধানিক মর্যাদা, অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ এবং ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ’—কোন পরিভাষাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্ক আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী পরিচয়ের আগে উপ-জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় বহন করত। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি ১৯৯৭ এ যা লিখিত ভাবে রয়েছে। এ চুক্তির আলোকে উপ-জাতি বা পরবর্তীতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা তাদের জন্য সংরক্ষিত। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট প্রস্তাব অধিবেশনে পাহাড়ের ৪ সংসদ সদস্যের দাবির প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীদের বেতন-ভাতা ও আয়ের উপর কর মওকুফ করা হয়। বর্তমান প্রচলিত সরকারি চাকরীর কোটা পদ্ধতিতেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রার্থীর জন্য ১ শতাংশ রাখা হয়। যা পার্বত্য ৩ জেলার স্থানীয় সকল নিয়োগের ক্ষেত্রে সিংগভাগ।

এ ছাড়া তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, টাস্কফোর্স ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত। এছাড়া সংস্কৃতি বিকাশে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

একদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নথি ও সরকারি পরিভাষায় ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘নৃ-গোষ্ঠী’ ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এনে আরেকটি পক্ষ বলছে, নতুন করে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পরিভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই বিতর্কের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—ইতোমধ্যে সংবিধান, আইন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর জন্য যে অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, তার বাইরে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি কেন এবং এর বাস্তব তাৎপর্যই বা কী?

সংবিধানে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এসব জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি সাংবিধানিক ভিত্তি পেয়েছে।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে ২০১০ সালে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ প্রণয়ন করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই আইনের আওতায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের অধিবেশনেও বাংলাদেশ এসব কার্যক্রম উপস্থাপন করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ ব্যবস্থা

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় রয়েছে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এ অঞ্চলের প্রশাসন, ভূমি, স্থানীয় সরকার ও জনগোষ্ঠীগত বিভিন্ন প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আলোকে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর জন্য বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা সংরক্ষিত রয়েছে। সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রার্থীদের জন্য কোটা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের মতো ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।

‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি কেন চান পাহাড়ের সংগঠনগুলো?

এত এত সুযোগ সুবিধার মাঝেও বিতর্কিত আদিবাসী স্বীকৃতি চাওয়ার পেছনের কারন জানতে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের নেতৃত্ববৃন্দের সাথে কথা হয় সাউথইস্ট এশিয়া জার্নালের পক্ষ থেকে। এবিষয়ে সাক্ষাতে কথা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একাংশের (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ‘আদিবাসী দিবস উদযাপন ২০২৬’-এর আহ্বায়ক সুধাকর ত্রিপুরার সঙ্গে।

পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?

সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ‘আদিবাসী’ শব্দ লেখা নেই—এ কারণে পরবর্তীকালে ওই পরিচয়ের দাবি করা যাবে না, এমনটি নয়। তার ভাষায়, “পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে আদিবাসী লেখা ছিল না মানে এ নয় যে আমরা পরবর্তীতে মৌলিক এ অধিকার দাবি করতে পারব না।”

তিনি সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতির অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা খুবই কম। তাঁর মতে, “তারা তো দেশের বাকি ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের জন্য হুমকি হতে পারেন না।”

সুধাকর ত্রিপুরার ভাষ্য, ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি মূলত একটি পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য। যদি সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে তাদের অধিকার সংরক্ষণ করে থাকে, তাহলে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিতে বাধা কোথায়—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, স্বীকৃতি না দেওয়ার পেছনে স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব রয়েছে।

ইতিবাচক দৃষ্টান্ত থেকে সমাধানের প্রস্তাব

ভাষা গবেষক ও বেসরকারি উন্নয়ন খাত বিশেষজ্ঞ মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার সঙ্গেও কথা হয় এ বিষয়ে। তিনি বলেন, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার চাইলে সেসব দেশের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টান্ত পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে।

পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?

অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল শব্দের ব্যবহার নয়; বরং রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্ন।

সংস্কৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রের নেওয়া উদ্যোগের কথাও উঠে আসে আলোচনায়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আগে থেকেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি সংরক্ষণে সারাদেশে ১০ টি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঞ্যোহ্লা মং বলেন, খাগড়াছড়িতে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, অহমিয়া, সাঁওতাল ও গারোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি চর্চা, সংরক্ষণ ও বিকাশে সরকারের প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিবছর এসব জনগোষ্ঠীর শিল্পীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?

সরকারি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’-এও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

‘বিশেষ সুবিধা থাকলে নতুন স্বীকৃতির দাবি কেন?’

তবে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবির বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের।

সংগঠনটির খাগড়াছড়ি জেলা আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ বলেন, সরকার পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে একতরফা ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে। চাকরি, রাজনীতি, আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড ও টাস্কফোর্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও তারা পাহাড়ি, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিচয়ে সুবিধা পেয়ে থাকেন বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর প্রশ্ন, এসব পরিচয় ও সুবিধা বহাল থাকা অবস্থায় ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির জন্য নতুন করে দাবি তোলার পেছনে কী কারণ রয়েছে?

পাহাড়ে পরিচয়ের রাজনীতি: বিদ্যমান সুবিধার পরও কেন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি?

আব্দুল মজিদের ভাষায়, ব্যবসা বাণিজ্যের সময় তারা পাহাড়ি, উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হতে পারলেও বিশেষ কারণে আদিবাসী স্বীকৃতি দাবি করা অবশ্যই রহস্য ও ষড়যন্ত্রের আভাস দেয়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্য ও ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের আরও কার্যকর হস্তক্ষেপ চান।

রাষ্ট্রের অবস্থান কী?

‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের অবস্থানও নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি দপ্তর থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ২০২২ সালের ১৯ জুলাই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি স্মারক। স্মারক নম্বর ১৫.০০.০০০০.০২৪.১৮.১৮৩.১৪.৫৯৬। এতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টকশোসহ গণমাধ্যমের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক অবস্থান প্রচারের জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়। সরকারি অবস্থানের ভিত্তি হিসেবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ব্যবহৃত ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ পরিভাষার কথা উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ২০১৪ সালেও তথ্য অধিদপ্তর থেকে গণমাধ্যম ও সরকারি জনসংযোগ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন নথি ও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০১০ সালেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ‘আদিবাসী’ সম্বোধন না করার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়।

‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গা কোথায়?

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে মূলত দুটি প্রশ্ন।

প্রথমত, ‘আদিবাসী’ কি কেবল একটি সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, নাকি এর সঙ্গে ভূমি, রাজনৈতিক অধিকার, স্বশাসন, প্রথাগত অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর অতিরিক্ত কিছু প্রশ্ন যুক্ত হয়?

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো যেখানে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ পরিভাষা ব্যবহার করছে, সেখানে নতুন করে ‘আদিবাসী’ শব্দকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও পরিণতি কী হতে পারে?

‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির পক্ষের মানুষরা মনে করেন, এটি তাদের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জাতিসত্তাগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং অধিকারের প্রশ্ন। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষের বক্তব্য, বিদ্যমান সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই তাদের অধিকার ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে; নতুন পরিচয় সংযোজনের প্রয়োজন নেই।

‘সংখ্যায় কম, তাই হুমকি নয়’

সুধাকর ত্রিপুরার বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। তাঁর মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী খুবই ছোট একটি অংশ। ফলে তাদের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি—এমন ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

অন্যদিকে ‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে আপত্তিকারী পক্ষের যুক্তি হলো, প্রশ্নটি কেবল জনসংখ্যার অনুপাতের নয়; বরং রাষ্ট্রীয় পরিচয়, সাংবিধানিক পরিভাষা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভৌগলিক অবস্থানের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

ফলে একই শব্দকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

বিএনপির অবস্থান কী?

বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার সঙ্গেও কথা বলে সাউথইস্ট এশিয়া জার্নাল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর পাহাড়ে রাজনৈতিক সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে নানা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো সরকার রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারবে না।

তাঁর বক্তব্য, বর্তমান সরকার পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত সব জাতিগোষ্ঠীর সম্মানজনক পরিচয় নিশ্চিত এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কাজ করছে। পাহাড়ের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নেও বিএনপি সরকার কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন।

সামনে কোন পথে সমাধান?

‘আদিবাসী’ পরিচয়ের প্রশ্নটি এখন আর শুধু একটি শব্দের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংবিধান, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ভূমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক পরিসর, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো একাধিক বিষয়।

রাষ্ট্রীয় অবস্থান একদিকে সংবিধানে স্বীকৃত ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ পরিভাষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করছে, তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিচয় ও অধিকারকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত করতে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি প্রয়োজন।

এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আবেগনির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে সংবিধান, শান্তিচুক্তি, প্রচলিত আইন, ঐতিহাসিক দলিল, নৃতাত্ত্বিক গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি উন্মুক্ত ও তথ্যভিত্তিক জাতীয় সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে এর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত অঞ্চলটিকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিচয়, জাতিসত্তা ও রাজনৈতিক অধিকারকে ঘিরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের তৎপরতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানা সময় উদ্বেগ ও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা, পৃথক ভূখণ্ডের ধারণা কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার যে আশঙ্কা বিভিন্ন মহল থেকে তুলে ধরা হয়, তা জাতীয় নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *