জাতীয় স্বার্থে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার বন্ধের দাবিতে ঢাকায় সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সমাবেশ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
জাতীয় সংহতি, পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই সম্প্রীতি এবং সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় স্বার্থে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে সিএইচটি সম্প্রীতি জোট। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত, বৈষম্যহীন উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশ ও সংহতি সম্মেলন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। ‘সিএইচটি সম্প্রীতি জোট’-এর উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক।
বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের মূলভিত্তি হলো সব নাগরিকের সমান অধিকার ও অভিন্ন জাতীয় পরিচয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি ও অ-বাঙালি নির্বিশেষে সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। জাতীয় সংহতি অক্ষুণ্ন রাখতে পরিচয় ও পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা সংরক্ষণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ঐক্যও সুদৃঢ় করা সম্ভব। পাহাড়ের উন্নয়নে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি না করে সব জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে ‘উপজাতি’ কিংবা ‘সেটলার’-এর মতো দূরত্ব সৃষ্টিকারী মানসিকতা পরিহার করা প্রয়োজন। পাহাড়ে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিকের অবদানকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কর্মসূচি পৌঁছে দিতে হবে।
তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক সুবিধার পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সম্প্রদায়ের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পাহাড়ে বসবাসরত সব নাগরিকের জন্য সমতার ভিত্তিতে আয়কর ছাড়সহ প্রাসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে খাগড়াছড়ি জেলা প্রধান সমন্বয়ক নিজাম উদ্দিন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন জাতিসত্তা ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের অঞ্চল। এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে অবৈধ অস্ত্র ও সশস্ত্র সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, জাতিগত পরিচয় যার যার, বাংলাদেশি পরিচয় সবার—এই মূল্যবোধকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভাজনমুখী রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে সব জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো বিভাজন তৈরি না করে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় পরিভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, পরিচয়ের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিভাজন বা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ যেন পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি ও জাতীয় সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে।

সমাবেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব নাগরিকের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণ, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ বিভিন্ন দাবি ও প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সমাবেশে জনতার দলের মুখপাত্র মেজর )অব.) ডেল এইচ. খান, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর, স্টুডেন্ট ফর সার্বভৌমত্বের সভাপতি জিয়াউল হক, লেখক ও কলামিস্ট এইচ. এম. ফারুক, গণ অধিকার পরিষদের নেতা ফারুক হাসান, জীবন চাক, মো. রহিম, উথোয়াই মে মারমা, মেন রাও ম্রো, থংপং ম্রো, অং সিং থোয়াই মারমা এবং উ সাইন থোয়াই মারমাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সমাবেশটি জাতীয় সংহতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমঅধিকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।