যুবসমাজের জন্য খেলা, অসহায়দের জন্য মানবিকতা- সম্প্রীতির বার্তা ছড়াল সিন্দুকছড়ি জোন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারাকে আরও সুদৃঢ় করতে ক্রীড়া ও মানবিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিন্দুকছড়ি জোন। যুবসমাজকে মাদক ও নানা সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং একই সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মানিকছড়িতে আয়োজন করা হয়েছে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ, চিকিৎসাসেবা ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচি।
সেনাবাহিনীর ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন সিন্দুকছড়ি জোনের উদ্যোগে আয়োজিত প্রীতি ফুটবল ম্যাচে মুখোমুখি হয় মানিকছড়ি উপজেলা একাদশ ও গুইমারা উপজেলা একাদশ। জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর টাইব্রেকারে ৫-৪ গোলে জয় পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে মানিকছড়ি উপজেলা একাদশ।
বিকেলে মানিকছড়ির রাণী নিহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অতিথিদের নিয়ে পায়রা উড়িয়ে প্রীতি ম্যাচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সিন্দুকছড়ি জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর মো. মাজহার হোসেন রাব্বানী।

খেলার শুরু থেকেই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের উত্তেজনা। প্রথমার্ধে কোনো দলই গোলের দেখা না পেলেও দ্বিতীয়ার্ধে উভয় দলই একটি করে গোল করলে ম্যাচ ১-১ গোলে সমতায় শেষ হয়। পরে টাইব্রেকারে ৫-৪ গোলে গুইমারা উপজেলা একাদশকে পরাজিত করে মানিকছড়ি উপজেলা একাদশ।
খেলা শেষে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান, মানিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা আমির মাওলানা মনিরুজ্জামান, ওয়াদুদ ভূঁইয়া ফাউন্ডেশনের প্রধান সংগঠক মিজানুর রহমান, গুইমারা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সোহাগ, মানিকছড়ি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
খেলাধুলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করার বার্তা
আয়োজকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের তরুণ ও যুবসমাজকে সুস্থ, সৃজনশীল ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে মাদক, কিশোর অপরাধ ও নানা ধরনের সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণদের দূরে রাখতে নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সিন্দুকছড়ি জোনের এ আয়োজন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্য বাড়ানো, তরুণদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলার একটি মাধ্যম হিসেবেও প্রীতি ম্যাচটি গুরুত্ব পেয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, একই মাঠে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিদের একত্রিত করে এমন আয়োজন পার্বত্য অঞ্চলে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। খেলাধুলার মাঠে পরিচয় ও বিভাজনের পরিবর্তে প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়।
ফুটবলের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা
প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আগে একই দিনে সিন্দুকছড়ি জোনের উদ্যোগে মানিকছড়ি ইংলিশ স্কুল মাঠে আয়োজন করা হয় একটি মানবিক কর্মসূচি। সেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি মিলিয়ে ১৩০ জনকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে দুটি হুইলচেয়ার ও তিন বান ঢেউটিন বিতরণ করা হয়। এসব সহায়তা পেয়ে উপকারভোগীরা সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সিন্দুকছড়ি জোনের এ ধরনের কার্যক্রমে একই দিনে একদিকে যেমন তরুণদের জন্য খেলাধুলার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য নিশ্চিত হয়েছে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা। ফলে পুরো আয়োজনটি ক্রীড়া, মানবিকতা ও সম্প্রীতির একটি সমন্বিত উদ্যোগে পরিণত হয়।
সম্প্রীতির বন্ধন আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে সামাজিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের গুরুত্ব রয়েছে। সেই বিবেচনায় সিন্দুকছড়ি জোনের এ উদ্যোগকে স্থানীয়রা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি যুবসমাজকে মাঠমুখী করতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের মাদক ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
সিন্দুকছড়ি জোনের এই আয়োজন তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয়-পরাজয়ের গল্প নয়; বরং খেলাধুলার মাধ্যমে যুবসমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়া, মানবিক সহায়তার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে পাহাড়ে সম্প্রীতির পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার একটি সম্মিলিত প্রয়াস হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।