আলীকদমের দুর্গম কুরুকপাতায় ম্রো সম্মেলন, উন্নয়ন-নিরাপত্তা ও জীবনমান নিয়ে মতবিনিময়
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলার দুর্গম ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ম্রো সম্মেলন-২০২৬’। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আলীকদম জোনের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ম্রো জনগোষ্ঠীর শান্তি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ পাহাড়ি জনপদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও মতবিনিময় হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) আয়োজিত সম্মেলনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ম্রো সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। সম্মেলনে ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আশিকুর রহমান আশিক, নবাগত জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফরহাদুর রহমান এবং আলীকদম উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম।
এ ছাড়া সম্মেলনে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং মুরুং, মুরুং নেতা মেনদন মুরুং, ইয়ংলক মুরুংসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
শিক্ষা-চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকার ও সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ম্রো জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে আলীকদম ও লামা উপজেলার দরিদ্র ও অনাথ ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ম্রো কমপ্লেক্সে থাকা-খাওয়ার সুবিধাসহ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
অতীতে এ অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্যরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

শান্তি-নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অব্যাহত রাখার প্রত্যয়
বিদায়ী আলীকদম জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আশিকুর রহমান আশিক বলেন, আলীকদম ও লামা উপজেলার শান্তি, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আলীকদম জোন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এলাকার নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার এ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং মুরুং বলেন, ম্রো জনগোষ্ঠী সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এ অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একসময় সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে পাহাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হতো। বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।
তিনি বলেন, নবনির্মিত ‘আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়ক’ দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের জন্য যোগাযোগের নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। এ সড়কের ফলে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
শান্তি ও উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখতে সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর দাবি
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
দিনব্যাপী সম্মেলনে ম্রো জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হয়। স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মতবিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীরা।
ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘ম্রো সম্মেলন-২০২৬’।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।