তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে হাসিনার প্রত্যর্পণের শর্ত যুক্ত করা ‘অত্যন্ত রূঢ় ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ’: বীণা সিক্রি
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে যুক্ত করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে তিনি ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিক্রি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য ‘একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়’। তিনি জানান, তারেক রহমানের ভারত সফরের তারিখ চূড়ান্ত করতে দুই দেশের সরকার এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সিক্রি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের বিষয়টি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে—এটি বেশ বিস্ময়কর। গতকাল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নোট বা ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে, সেটি অত্যন্ত রূঢ় ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ। এমন পরিস্থিতি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের খেলা খেলছে কি না, তা আমি জানি না। তবে ভারত ও বাংলাদেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা এখনো চলছে। সফরের তারিখ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং প্রস্তুতিও চলছে। তারেক রহমান আসছেন না—বাংলাদেশ সরকারের এমন কোনো কথা আমরা এখনো শুনিনি।’
সিক্রি এএনআইকে বলেন, এ ধরনের মন্তব্যে তারেক রহমানের ভারত সফরের গুরুত্ব নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের ‘আন্তরিকতার অভাব’ প্রকাশ পায়। তিনি উল্লেখ করেন, তারেক রহমানের শপথের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে দুই দফা আমন্ত্রণ জানালেও বাংলাদেশ এখনো কোনো জবাব দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের গুরুত্ব নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের এক ধরনের গুরুত্বহীন মনোভাব প্রকাশ পায়।’
তিনি এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরও বলেন, ‘দুটি বিষয় বুঝতে হবে। প্রথমত, এ বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মোদির দেওয়া আমন্ত্রণটিই ছিল তার জন্য প্রথম আমন্ত্রণ। এটি ছিল আন্তরিক আমন্ত্রণ। মোদি তাকে ও তার পরিবারকে সুবিধাজনক সময়ে দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন ধারণা করা হয়েছিল, ভারতই হবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য। কিন্তু তা হয়নি। এরই মধ্যে ছয় মাস পেরিয়ে গেছে, অথচ কোনো জবাবই পাওয়া যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর কয়েক সপ্তাহ আগে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে ভারত থেকে তারেক রহমানকে দ্বিতীয়বার আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই আমন্ত্রণেরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।’
সাবেক এই কূটনীতিক এএনআইকে আরও বলেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য সময়ের সুযোগ খুবই সীমিত। তাই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টির সঙ্গে তারেক রহমানের ভারত সফরকে যুক্ত করার দাবি ‘একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’। এমনকি প্রত্যর্পণের অনুরোধের উদ্দেশ্যের সঙ্গেও এ ধরনের দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিক্রি বলেন, ‘প্রথমত, সবাই জানেন এবং বাংলাদেশের সরকারও অন্য সবার চেয়ে ভালো জানে যে, প্রত্যর্পণ একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটি শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে। লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে আমরা প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছি। এসব প্রক্রিয়া শেষ হতে অনেক বছর লেগেছে, কিছু এখনো শেষ হয়নি। এমনকি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একটি স্বাক্ষর বাকি থাকে। তাহলে কি তারেক রহমান বলছেন, তিনি আগামী দুই-তিন বছর ভারতে আসতে চান না? প্রশ্ন হলো সেটিই।’
তিনি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এখন দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতি চলছে এবং সফরের সময়ও খুব সীমিত, সম্ভবত চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এর পরিবর্তে এসব বিষয় সামনে আনা হচ্ছে। আমি এটিকে হাস্যকর বলব না। তবে এটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং প্রত্যর্পণের উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।’
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে সিক্রি এসব মন্তব্য করেন বলে এএনআই এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই পোস্টে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে রয়েছেন।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। রোববার (১৬ আগস্ট) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।
তবে আলোচনা চললেও এখনো সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ হয়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের পাশাপাশি শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদেরও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত দিতে ভারতের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এএনআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লিতে আয়োজিত শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছে ভারত। দেশটি বলেছে, অনুষ্ঠানটি একটি ‘বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান’ আয়োজন করেছে এবং সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্যের সঙ্গেও ভারত সরকার একমত নয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আপনারা যে অনুষ্ঠানের কথা বলছেন, সেটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে। এর সঙ্গে সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে যেসব মতামত দেওয়া হয়ে থাকতে পারে, সরকার সেগুলোর কোনোটি সমর্থন করে না।’
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।