২৫ বছর পর মায়ের কাছে ফিরলেন উখিয়ার হারিয়ে যাওয়া ফরিদ

২৫ বছর পর মায়ের কাছে ফিরলেন উখিয়ার হারিয়ে যাওয়া ফরিদ

২৫ বছর পর মায়ের কাছে ফিরলেন উখিয়ার হারিয়ে যাওয়া ফরিদ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

“ও বাপ, তুই হডে আছিলা! ও বাপ বাপ, তোরে ইদিলা হনে গইজ্জে! ১০ বছর গুরা হালে তোরে দেইকখি, আর ন দেহি। ২৫ বছর পর তোরে পাইয়্যি।”

কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলতে বলতে কাঁদতে কাঁদতে ২৫ বছর পর ফিরে আসা ছেলে মোহাম্মদ ফরিদকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মা নূরজাহান বেগম।

যে ছেলেকে পরিবার ২৫ বছর ধরে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, সেই মোহাম্মদ ফরিদ দীর্ঘ ২৫ বছর পর শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার নিজ বাড়িতে ফিরেছেন।

১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে বিদেশে যাওয়ার পর মানবপাচারের শিকার হয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ফরিদের। দীর্ঘ সময় পর গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি।

দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না ফরিদ। নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং উখিয়া, কক্সবাজার—এটুকু ছাড়া তিনি তেমন কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না। বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি তাঁকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে।

এরপর ফরিদকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে শুরু হয় অনুসন্ধান। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় তাঁর পরিবারের সন্ধান পান।

গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

কথোপকথনের একপর্যায়ে সৈয়দ আলম জানান, ফরিদের এক হাতে একটি আঙুল বেশি, অর্থাৎ তাঁর ছয়টি আঙুল রয়েছে। ছোটবেলার এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই দুই ভাইয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

ফরিদ ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান ফরিদ। পরে তাঁরা পাকিস্তানে পৌঁছান। পাকিস্তানে জীবিকার সন্ধানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এতে তাঁর দুই পা কেটে ফেলতে হয়।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার পর এক মানবপাচারকারী তাঁকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এরপর পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান ফরিদ। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি তাঁর। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান তিনি। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। পরে তুরস্কের পুলিশ তাঁকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফরিদকে তাঁর ছোট ভাই ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেল এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ভাইকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত সৈয়দ আলম বলেন, “আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাঁকে ফিরে পেয়ে আমাদের আনন্দ আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।”

আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্র্যাকের সহায়তায় বড় ভাই ফরিদকে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ার উদ্দেশে রওনা হন সৈয়দ আলম। শুক্রবার সকালে তাঁরা বাড়িতে পৌঁছান। এ সময় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের স্থানীয় কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে তারা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিতে পেরেছেন। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাঁদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি বলেন, “১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।”

শরিফুল ইসলাম হাসান আরও বলেন, শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই নয়, ফরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও কিছু করতে চান তাঁরা, যাতে তিনি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম বলেন, মানবপাচারের ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্নভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এসব পথে মানবপাচার প্রতিরোধে আরও সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *