লংগদু থেকে উদ্ধার বিরল হিমালয়ান গন্ধগোকুল ফিরে গেল গভীর অরণ্যে
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটির লংগদু থেকে উদ্ধার করা বিরল বন্যপ্রাণী ‘হিমালয়ান গন্ধগোকুল’ ফিরে গেছে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে। বন বিভাগের উদ্যোগে রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে প্রাণীটিকে পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গভীর অরণ্যে অবমুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে ‘পাহাড়ি ভাম’ নামে পরিচিত নিশাচর এই প্রাণীটি লংগদু উপজেলার উত্তর ইয়ারাংছড়ি এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুর রাজ্জাকের কাছে ছিল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাণীটি কিনে নিজের কাছে রেখেছিলেন তিনি। বিষয়টি জানতে পেরে প্রাণীটি উদ্ধারে তৎপর হয় বন বিভাগ।
উল্টাছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. গোলাম কবির জানান, শনিবার প্রাণীটিকে উদ্ধার করা হয়। তবে সেদিন প্রতিকূল আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে সেটিকে অভয়ারণ্যে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে বন বিভাগের হেফাজতে নিরাপদে রাখার পর রোববার দুপুরে পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের উল্টাছড়ি রেঞ্জ এলাকায় অবমুক্ত করা হয়।
তিনি বলেন, অবমুক্ত করার সময় গন্ধগোকুলটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল। বনাঞ্চলে ছেড়ে দেওয়ার পর প্রাণীটি দ্রুত প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা জানান, হিমালয়ান গন্ধগোকুল বাংলাদেশের পার্বত্য বনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। নিশাচর এই প্রাণী সাধারণত রাতের বেলায় খাবারের সন্ধানে বের হয়। ফলমূল, পোকামাকড় ও ছোট প্রাণী খেয়ে জীবনধারণ করে। দিনের বেশিরভাগ সময় উঁচু গাছের ডাল, ঘন ঝোপঝাড় কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করে।
পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল বলেন, পাহাড়ি ভাম বা হিমালয়ান গন্ধগোকুল প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী কেনাবেচার কারণে এ প্রাণীসহ পাহাড়ের বিভিন্ন বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়ছে।
রাঙামাটির বন সংরক্ষক মো. আবদুল আউয়াল সরকার বলেন, প্রাণীটির অবস্থানের খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয়। পরে এর জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ আবাসস্থল বিবেচনায় পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “পাবলাখালী দেশের অন্যতম বৃহৎ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে। তাই প্রাণীটি সেখানে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী।”
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্যপ্রাণীকে লোকালয় থেকে উদ্ধার করে তার উপযুক্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে এলে বা মানুষের হাতে ধরা পড়লে সেটিকে পোষা কিংবা বিক্রি না করে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগকে জানানো প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে বন্যপ্রাণী ধরে পোষা ও কেনাবেচার প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে প্রাণীগুলো তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যশৃঙ্খল ও বনজ প্রতিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি, উদ্ধার অভিযান এবং উদ্ধার করা প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থলে অবমুক্ত করার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
লংগদু থেকে উদ্ধার হওয়া হিমালয়ান গন্ধগোকুলটির নিরাপদে গভীর অরণ্যে ফিরে যাওয়া তাই শুধু একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা নয়; এটি পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষের দায়িত্বেরও একটি বার্তা। অরণ্যের এই নিশাচর প্রাণীটির প্রকৃত ঠিকানা যে মানুষের ঘর নয়, বরং মুক্ত ও নিরাপদ বনভূমি—তার ফিরে যাওয়া যেন সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।