লোহিত সাগরকে ঘিরে নতুন উত্তেজনায় বাংলাদেশের বাণিজ্য ও জ্বালানির লাইফলাইন ঝুঁকিতে
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়—বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নতুন করে চাপে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংঘাত ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে—এই বিকল্প নৌপথটির গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই বেড়েছিল। এখন সেটি নিয়েই দেখা দিচ্ছে উদ্বেগ।
লোহিত সাগরে সংঘাত আরও বাড়লে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এশিয়া থেকে ইউরোপের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে জাহাজের গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় (ট্রানজিট লিড টাইম) ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়বে। পাশাপাশি বিমা মাসুল ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে জাহাজ ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবসায়ীরা একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যখন ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করলে—ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছিল হুথিরা। চলতি বছর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের জবাবে সৌদি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করে– হুথিরা লোহিত সাগরে ফের হামলা শুরু করেছে।
সর্বশেষ উদ্ভূত এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি—উভয় পথেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের সরবরাহ শৃঙ্খল আরও গভীর সংকটে পড়বে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের গতকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত অগ্রসর হয়ে হুথি বাহিনী ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। আল জাজিরার বরাতে জানা যায়, ইরাক থেকে চালানো ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে—সৌদি আরব তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের রুট—ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধানতম সামুদ্রিক করিডোর হওয়ায় এসব ঘটনাপ্রবাহের সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে বাংলাদেশের ওপর।
বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য এবং শিপিং খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তথ্য বিশ্লেষক ও ট্র্যাকিং সংস্থা–কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী জাহাজগুলো বিকল্প পথে ঘুরে গেলে, যাত্রার সময় ২৪ দিন থেকে বেড়ে প্রায় ৫৪ দিনে গিয়ে ঠেকবে।
দীর্ঘ পথ, চড়া জাহাজ ভাড়া
দেশের শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, লোহিত সাগর হলো ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধানতম সমুদ্রপথ। এই পথ ব্যাহত হলে জাহাজগুলোকে কেপ অব গুড হোপ (উত্তমাশা অন্তরীপ) হয়ে ঘুরে যেতে হবে। এতে সময় যেমন বেশি লাগবে, তেমনই পরিবহনের খরচ বা ফ্রেইট কস্টও বহুগুণ বেড়ে যাবে।”
তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালির বিধিনিষেধের পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের যে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হয়, সেটিও বড় ধাক্কা খাবে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ খান জানান, লোহিত সাগরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “এই পথ যদি বন্ধ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ইউরোপে বাংলাদেশের কনসাইনমেন্ট (পণ্যের চালান) পৌঁছাতে বাড়তি ১৫ দিনের মত সময় লাগতে পারে।”
“এতে ফুয়েল চার্জ, জাহাজের ইন্স্যুরেন্স চার্জসহ অন্যান্য খরচ যোগ হলে—জাহাজ ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে” –বলেন তিনি।
বাফার সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, এই পরিস্থিতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে।
তিনি বলেন, “লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। তবে মেইনলাইন অপারেটরদের (এমএলও) পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ফ্রেইট ভাড়া বাড়ানোর বা জাহাজের শিডিউল পরিবর্তনের অফিসিয়াল কোনো নোটিশ পাওয়া যায়নি। তবে সোমবার নাাগাদ পেতে পারি, তখনই বোঝা যাবে কী ধরণের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।”
২০২৩ সালে বিদেশি জাহাজে হুথিদের বেশ কিছু আক্রমণের পর থেকেই মেইনলাইন অপারেটররা (এমএলও) সতর্ক অবস্থান নেয় এবং অধিকাংশ কনটেইনারবাহী জাহাজ তখন থেকেই উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কনটেইনার ও লজিস্টিকস তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান– সোজেস-এর সেপ্টেম্বর মাসের ইউরোপ কনটেইনার মার্কেট আপডেট অনুযায়ী, উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে জাহাজ ঘুরে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক কনটেইনার সক্ষমতার প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ পথেই আটকে থাকছে, যা প্রায় ১৭ লাখ থেকে ২৪ লাখ টিইইউএস কনটেইনার ধারণক্ষমতার সমতুল্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষস্থানীয় একটি এমএলও-র জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, “গত তিন বছর ধরেই আমরা লোহিত সাগর এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করছি।” তবে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির নতুন দরবৃদ্ধি – সরাসরি জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট রেটকে বাড়িয়ে দেবে।
ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্রেইট বা পরিবহন খরচ বাড়ার এই অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর।
এফওবি-ভিত্তিক রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজে তুলে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফ্রেইটের মূল খরচ বিদেশি বায়াররা (ক্রেতা) বহন করে থাকেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস খরচ লাফিয়ে বাড়লে—ক্রেতারা সেই বাড়তি খরচের কিছু অংশ রপ্তানিকারকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন, যার ফলে পরোক্ষ চাপে পড়েন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, ছোট ও মাঝারি সাইজের রপ্তানিকারকরা এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।
তিনি বলেন, “শিপিং ভাড়া বাড়লে বায়াররা সেই খরচের কিছু অংশ সরবরাহকারীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করতে পারে। বিশেষত ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে—এই বাড়তি লজিস্টিকস খরচের বোঝা নিজেরা বহন করতে বাধ্য হতে পারে।”
তবে এই চাপ সবচেয়ে তীব্র হবে ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড (এলডিপি) চুক্তির আওতায় রপ্তানি করা ব্যবসায়ীদের ওপর, যেখানে বায়ারের গুদাম বা ওয়্যারহাউজ পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব ও খরচ থাকে বিক্রেতা বা রপ্তানিকারকের ওপর।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের ৫ থেকে ১০ শতাংশ চালান এলডিপি পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এই ব্যবস্থার অধীনে রপ্তানি করা কারখানাগুলোকে বাড়তি জাহাজ ভাড়ার সম্পূর্ণটাই নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হবে।
গভীর হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি
বিশ্বের প্রধান প্রধান সামুদ্রিক রুটে একই সঙ্গে বাধার কারণে—বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জ্বালানি তেল-গ্যাস আমদানি এবং এর সার্বিক খরচের জন্য নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।
গত শুক্রবারে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৪.৬১ ডলারে গিয়ে ঠেকে, যা এক মাস আগেও ছিল ৮৭.০৭ ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ যেসব অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে তার অন্যতম প্রধান– মুরবান ক্রুড-এর দাম মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্যারেল প্রতি ৮২.২৫ ডলার থেকে লাফিয়ে ১১৯.৪৬ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি এশীয় এলএনজি বেঞ্চমার্ক জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম)-এর দর বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪.৮২ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, বাংলাদেশের উচিত পরিস্থিতি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা এবং দ্রুত জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেলের মজুদ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া। তিনি বলেন, “বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ফলে আমরা একটি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।”
“বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য, বিশেষ করে ডিজেলের জাতীয় মজুদ দ্রুত বাড়ানোর বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রেও ইতিমধ্যে ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে,” যোগ করেন ম তামিম।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের প্রধান প্রধান তেল পরিবহন পথগুলো একসাথে অচল হয়ে পড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ চরমভাবে সংকুচিত হবে।
“সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে তেল পরিবহন বন্ধ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের ভয়াবহ ঘাটতি দেখা দেবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত কাজ হলো—পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং মজুদ বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া,” বলেন তিনি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর হরমুজ দিয়ে যাওয়া এই মোট জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশই আসে এশিয়ার বাজারে।
এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে সংকটের মধ্যে কিছু চালানের জন্য বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দেব হয়ে লোহিত সাগরের রুটটি ব্যবহার করা হচ্ছিল।
শিপিং তথ্যে এই স্থানাান্তরের রূপ ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘পোর্টওয়াচ’ প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, এপ্রিলে ও মে মাসে সৌদি আরবের তেলের কার্গো চালান আগের বছরের ৪ কোটি ৭৫ লাখ টন থেকে কমে মাত্র ৬৩ লাখ টনে নেমে আসে। বিপরীতে লোহিত সাগর দিয়ে দেশটির তেল রপ্তানি ২ কোটি ৯৬ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৪৮ লাখ টনে দাঁড়ায়—যা হরমুজ বন্ধের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির প্রায় ৬১ শতাংশ পূরণ করেছিল।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের ২ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র ৪৯ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
– টিবিএস