অধিকারের রাজনীতি কি সবার জন্য সমান?
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার, নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে—অধিকার কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি অপরাধীর পরিচয় ও জাতিগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতিবাদের মাত্রা নির্ধারিত হয়? রুমার তংমক পাড়ায় ১৫ বছর বয়সী এক মারমা কিশোরীকে চার মারমা যুবকের ধর্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে তার গর্ভপাতের অভিযোগে চারজনকে পুলিশ আটক করার ঘটনা এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে অভিযুক্তরা সবাই একই সম্প্রদায়ের হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও তথাকথিত মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জুম চাষের মৌসুমে কিশোরীর বাবা-মা রাতে জুমঘরে অবস্থান করার সুযোগে তাকে প্রথমে ক্য সিং নু মার্মা অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ধর্ষণ করেন। পরে তিনি বিষয়টি তার দুই বন্ধু উহাইমং মার্মা ও সিংহ্লা মার্মাকে জানালে তারাও কিশোরীকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তংমক পাড়ার আরেক বাসিন্দা উশৈনু মার্মার বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ সময় বিষয়টি গোপন থাকার পর কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী সময়ে গর্ভপাতের ওষুধ সেবনের পর অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে পরিবারের দাবি।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ রোববার পৃথক অভিযান চালিয়ে ক্য সিং নু মার্মা, উহাইমং মার্মা, সিংহ্লা মার্মা ও উশৈনু মার্মাকে আটক করেছে। রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া জানিয়েছেন, ধর্ষণের অভিযোগে চারজনকে আটক করে থানায় রাখা হয়েছে এবং তাদের আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশি তদন্ত ও আদালতের বিচারেই এখন অভিযোগের সত্যতা ও প্রত্যেকের দায় নির্ধারিত হবে—এটাই আইনের স্বাভাবিক পথ।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্নটি হলো, এই ভয়াবহ অভিযোগ সামনে আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা নিয়মিত মানবাধিকার, নারী অধিকার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দাবি করেন, তাদের কণ্ঠ কোথায়? অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে একজন ১৫ বছরের কিশোরীর ওপর ধারাবাহিক যৌন নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তার গর্ভপাতের মতো গুরুতর ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবি ওঠা কি তার জাতিগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও জাতিগত অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সেই অধিকারচর্চা যদি বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তার নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি বাঙালি হলে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত প্রতিবাদ, বিবৃতি, মানববন্ধন কিংবা রাজপথের কর্মসূচি দেখা যাবে; অথচ অভিযুক্তরা নিজেদের সম্প্রদায়ের হলে একই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে নীরবতা নেমে আসবে—এমন অভিযোগ যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি কোনো জাতিগোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকারও নয়। একজন মারমা কিশোরী, একজন চাকমা নারী, একজন ত্রিপুরা শিশু কিংবা একজন বাঙালি নারী—অপরাধের শিকার হলে প্রত্যেকের অধিকারের মূল্য সমান। অপরাধীর পরিচয় বদলে গেলে অপরাধের চরিত্র বদলে যায় না। ধর্ষণ ধর্ষণই; শিশু নির্যাতন শিশু নির্যাতনই; হত্যাকাণ্ড হত্যাকাণ্ডই। অপরাধীর জাতিগত পরিচয় দিয়ে অপরাধের গুরুত্ব কমানো বা বাড়ানো কোনো সভ্য সমাজের ন্যায়বোধ হতে পারে না।
বরং সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার পরিবর্তে স্থানীয় সামাজিক বা প্রথাগত সালিশের মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ মীমাংসার চেষ্টা করা। ধর্ষণ বা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধকে সামান্য অর্থদণ্ড, পশুদণ্ড কিংবা সামাজিক মীমাংসার মাধ্যমে শেষ করে দেওয়ার সংস্কৃতি থাকলে সেটি ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের অধিকারকেই অস্বীকার করে। একই সঙ্গে অপরাধীর মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ ঘটার ঝুঁকিও থেকে যায়।
এখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব আরও বেশি। যারা পাহাড়ের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার কথা বলেন, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত পাহাড়ের মানুষকে আইনের প্রতি আস্থা রাখতে উৎসাহিত করা। কোনো অপরাধী নিজের সম্প্রদায়ের হলেই তাকে রক্ষা করা, বিষয়টি গোপন রাখা কিংবা সামাজিক চাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারকে চুপ করিয়ে দেওয়া কখনোই অধিকার রক্ষার রাজনীতি হতে পারে না। বরং এটি শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের সাধারণ মানুষকেই রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কোনো একটি ঘটনার সঙ্গে সেনাবাহিনী, বাঙালি জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আগে যেমন তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি পাহাড়ি সমাজের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। একদিকে তথ্য যাচাই ছাড়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং অন্যদিকে স্বজাতির অপরাধ আড়াল করা—দুটিই মানবাধিকারের মূল চেতনার পরিপন্থী।
তংমক পাড়ার ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপ অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তার বিচার হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে। আটক চারজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আবার তদন্তে অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ ন্যায়বিচার মানে শুধু কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়; সত্য উদঘাটন করাও ন্যায়বিচারের অংশ।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়, কোনো জাতিগোষ্ঠীও নয়—ভুক্তভোগী কিশোরী। তার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তার পরিবার যেন কোনো ধরনের ভয়ভীতি, সামাজিক চাপ কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় মামলা থেকে সরে যেতে বাধ্য না হয়, সেটিও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
পাহাড়ের মানুষকে অধিকার সচেতন করার নামে যদি তাদের রাষ্ট্রীয় আইন, বিচারব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; বরং তাদের আরও অনিরাপদ করে তোলা। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উচিত মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা তৈরি করা, অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং ভুক্তভোগীর পাশে থাকা। কারণ পাহাড়ের মানুষের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই, যখন একজন পাহাড়ি নারী বা শিশু তার নিজের সমাজের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও নির্ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারবে।
অধিকারের রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তাহলে তার প্রথম শর্ত হতে হবে—অপরাধীর কোনো জাতি নেই, ভুক্তভোগীরও কোনো জাতিগত পরিচয় দিয়ে তার অধিকারের মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না। পাহাড়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই তাই কোনো জাতির বিরুদ্ধে নয়; এটি অপরাধ, ভয়, দায়মুক্তি এবং পক্ষপাতের বিরুদ্ধে লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে নীরবতা নয়, সবার জন্য একই মানদণ্ডই হতে হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।