পাহাড়ে রক্তপাত ও সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা: এম এন লারমা এবং জেএসএসের বিতর্কিত অধ্যায়
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি নির্দিষ্ট নামকে কেন্দ্র করে গভীর বিতর্ক, চরম বিভাজন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চিত্র সামনে চলে আসে—তিনি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা)। ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই নেতার জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন পার্বত্য অঞ্চলের শান্ত পরিবেশকে চিরতরে অশান্ত করে তুলেছিল বলে মনে করেন বহু পর্যবেক্ষক ও ইতিহাসবিদ। পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সহিংসতার যে বীজ তিনি বপন করেছিলেন, তার খেসারত আজ চার দশক পরও ওই এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে।
পাহাড়ে সন্ত্রাসের সূচনা ও জেএসএস প্রতিষ্ঠা
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো ১৯৭২ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ (পিসিজেএসএস) প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে এর সশস্ত্র ডানা ‘শান্তিবাহিনী’ গঠন। পাকিস্তান আমলেই তিনি আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও, বাংলাদেশ স্বাধীনের পরপরই তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী স’শ’স্ত্র পথ বেছে নেয়। উপজাতীয় অধিকার আদায়ের নামে লারমার হাতেই পার্বত্য অঞ্চলে প্রথম সংগঠিত সন্ত্রাসের সূত্রপাত ঘটে।
যে সময় একটি সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই লারমা ও তাঁর দল পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসন ও নিজস্ব কাঠামোর দাবিতে সার্বভৌম রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের সাথে আলোচনার পথ খোলা থাকা সত্ত্বেও স’শ’স্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত পার্বত্য অঞ্চলকে এক দীর্ঘমেয়াদী ও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
শান্তিবাহিনীর তাণ্ডব ও রক্তে রাঙানো পাহাড়
এম এন লারমার আদর্শে পরিচালিত শান্তিবাহিনীর হাতে পার্বত্য অঞ্চলের হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। কেবল বাঙালি সেটলারই নয়, যেসব সাধারণ পাহাড়ি বা উপজাতি সদস্য জেএসএস-এর উগ্র নীতি সমর্থন করেনি, তাদেরকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গ্রামজুড়ে অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং নির্বিচার হত্যাকাণ্ড পাহাড়ের নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়। লারমার গঠিত এই সশস্ত্র বাহিনী পাহাড়ের নিভৃত কোণে হিংসা, ভয় ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের রাজনীতি
এম এন লারমা যে সশস্ত্র ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, তা আজ একটি বিশাল অপরাধমূলক অর্থনীতি বা ‘কালো বাজারে’ রূপ নিয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জেএসএস এবং পরবর্তীতে তা থেকে ভেঙে তৈরি হওয়া বিভিন্ন উপদল—যেমন ইউপিডিএফ—আজ পাহাড়ের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১। কোটি কোটি টাকার চাঁদা: পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জুমচাষী, পরিবহন মালিক থেকে শুরু করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার—সবাইকে নিয়মিত নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়। প্রতি বছর পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রায় শত শত কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে।
২। অবৈধ অস্ত্রের মজুদ: সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা এই চাঁদার টাকায় সীমান্ত অতিক্রম করে কেনা হয় আধুনিক ও মারাত্মক অবৈধ অস্ত্র।
৩। উন্নয়ন স্থবিরতা: অস্ত্রের দাপট ও চাঁদাবাজির ভয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন, উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে এবং পর্যটন খাত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ
এম এন লারমা দাবি করেছিলেন তিনি পাহাড়ি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করছেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত ও কাঠামোর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ খেটে খাওয়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠী।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে সং’ঘ’র্ষে’র কারণে বারবার ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে নিরীহ পাহাড়ি মানুষদের। সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেক সাধারণ পাহাড়িকে নিজস্ব ভিটামাটি ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। লারমার চালু করা এই সন্ত্রাসী কাঠামোর কারণে সাধারণ পাহাড়ি মানুষ আজও শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা থেকে বঞ্চিত।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও করুণ পরিণতি
যে হিংসার রাজনীতির জন্ম মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই হিংসাই তাঁকে গ্রাস করে। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর জেএসএস-এর ভেতরেরই একটি বিদ্রোহী উপদলের গুলিতে এম এন লারমা নিহত হন। নিজের তৈরি করা স’শ’স্ত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তাঁর এই পরিণতি প্রমাণ করে যে, বন্দুকের রাজনীতি কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। তবে তাঁর মৃত্যুর পর পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সহিংসতা বন্ধ হয়নি; বরং তা আরও একাধিক স’ন্ত্রা’সী উপদলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ি এলাকাকে আরও বেশি নরককুণ্ডে পরিণত করেছে।
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্মদিনে ফিরে তাকালে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। যদি সেদিন তিনি সশস্ত্র পথ বেছে না নিয়ে মূলধারার গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে পাহাড়ের মানুষের উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিতেন, তবে পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস আজ ভিন্ন হতে পারত।
একটি ভূখণ্ডের শান্তি ও সম্প্রীতি ধ্বংসের জন্য যে সশস্ত্র ব্যবস্থার জন্ম লারমা দিয়েছিলেন, তার মাশুল আজও গুনছে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ। পাহাড়ি-বাঙালি সকল নাগরিকের একটাই প্রত্যাশা—পাহাড়ের বুকে যেন আর কোনোদিন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মতো উগ্র ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী নেতার আবির্ভাব না ঘটে, এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন ফিরে পায় তার চিরকাঙ্ক্ষিত শান্তি ও নিরাপত্তা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।