সেনাবাহিনীর সহায়তায় মিজোরাম থেকে স্বদেশে ফিরলেন ৩ বম পরিবার, হাতে বাংলাদেশের পতাকা

সেনাবাহিনীর সহায়তায় মিজোরাম থেকে স্বদেশে ফিরলেন ৩ বম পরিবার, হাতে বাংলাদেশের পতাকা

সেনাবাহিনীর সহায়তায় মিজোরাম থেকে স্বদেশে ফিরলেন ৩ বম পরিবার, হাতে বাংলাদেশের পতাকা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

“স্বদেশ ও নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নিজের পাড়া, নিজের মানুষ আর জন্মভূমির টান সবসময় মনে ছিল।” প্রায় দুই বছর পর ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া বম সম্প্রদায়ের তিন পরিবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিজ পাড়ায় ফিরে এসে এভাবেই নিজেদের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই পরিবারের শিশুরা হাতে তুলে নেয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। ছোট্ট হাতে লাল-সবুজের পতাকা, চোখেমুখে স্বস্তি ও আনন্দ—দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আপন ভূমিতে ফিরে আসার আবেগঘন এই দৃশ্য উপস্থিত সবার নজর কাড়ে।

দীর্ঘদিন পর ভারতের মিজোরাম থেকে বান্দরবানের থানচি উপজেলার নিজ পাড়ায় ফিরেছেন বম সম্প্রদায়ের তিন পরিবারের ১৮ সদস্য। গতকাল রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাকলাইপাড়া সেনাবাহিনীর সাব-জোন ক্যাম্পের সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে তাদের নিজ নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তন করানো হয়।

স্বদেশে ফেরা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাকলাইপাড়া আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরী প্রতিটি পরিবারের হাতে নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৫০ কেজি চাল, ১০ কেজি ডাল, ৫ লিটার তেল, ৫ কেজি পেঁয়াজ, ৫ কেজি আলু ও ৫ কেজি লবণ তুলে দেন। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে একটি করে সোলার প্যানেল, একটি ব্যাটারি, একটি বালতি ও মগ, পাতিল, প্লেট, গ্লাসসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী দেওয়া হয়।

এ সময় তিনি পরিবারের কোমলমতি শিশুদেরও স্নেহ-আদর করেন।

শুধু প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সামগ্রী দিয়ে সহায়তা নয়, নিরাপদে স্বজন ও নিজ পাড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করে সেনাবাহিনী। একই সময়ে তিন পরিবারের সদস্যদের শেরকর ও প্রাতা পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শেরকর পাড়ার কারবারি তুমথন বম এবং প্রাতা পাড়ার কারবারি পার্কেল বম উপস্থিত ছিলেন।

ফিরে আসা তিন পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম (২৭), রুয়াতখুপ বম (৪৬) ও লালচম বম (৫৫) জানান, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ২০২৪ সালে থানচি ও রুমা উপজেলায় সোনালী ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় সেনাবাহিনীর অভিযানের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা ভারতে মিজোরামে চলে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় সেখানে থাকার পর অবশেষে সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে নিজ দেশ ও মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেন।

সেনাবাহিনীর সহায়তায় মিজোরাম থেকে স্বদেশে ফিরলেন ৩ বম পরিবার, হাতে বাংলাদেশের পতাকা

ভানরৌখম বম (২৭) বলেন, “মাতৃভূমি ও স্বদেশ ছেড়ে অন্য দেশে থাকলে কখনো নিজের বাড়ির মতো লাগে না। সেনাবাহিনীর সহায়তায় এতদিন পর নিজের গ্রামে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে এসেছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

রুয়াতখুপ বম (৪৬) বলেন, “বাড়িঘর, আত্মীয়-স্বজন ও নিজের পাড়ার কথা সবসময় মনে পড়ত। মিজোরামে থাকলেও মন পড়ে থাকত স্বদেশে। অনেক বছর পর আবার নিজের জায়গায় ফিরেছি।”

লালচম বম (৫৫) বলেন, “স্বদেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নানা কষ্টের মধ্যে এত বছর পার করেছি। এখন নিজের পাড়ায় ফিরে এসেছি। পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।”

ফিরে আসা পরিবারের প্রধানরা জানান, ২০২২-২৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় কেএনএফ সন্ত্রাসীরা বাকলাইপাড়া সেনা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পর রাতভর বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এরপর সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযানের কারণে সন্ত্রাসীরা নিরীহ গ্রামবাসীকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে, সাধারণ গ্রামবাসীকে হয়রাণি ও নানা নির্যাতন করতে থাকে। এসময় তারা রুমা ও থানচি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহার করে ভারতের মিজোরামে চলে যান। অনেক সময় তারা স্বপরিবারে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েও ছিলেন। পরে ২০২৪ সালে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা মিজোরামে চলে যান।

দীর্ঘদিন পর স্বদেশে ফেরার পেছনে আস্থা তৈরির প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বম সমাজ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে বম সোশ্যাল কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মিজোরামে অবস্থানরত পরিবারগুলোর কাছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং নিরাপদে দেশে ফিরে আসার বিষয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। বম সমাজের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে পরিবারগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা স্বদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয় ১২ সেপ্টেম্বর। মিজোরাম হয়ে হরিণা ও রাঙামাটি দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরদিন ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাঙামাটি থেকে তাদের বাকলাইপাড়া সাব-জোন ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দীর্ঘদিন পর স্বদেশের মানুষের কাছে ফিরে আসায় পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা যায় স্বস্তি ও আবেগের অনুভূতি।

স্বদেশে ফিরে আসা তিন পরিবারের মধ্যে থানচি সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেরকর পাড়ার দুটি পরিবারের সদস্য ১৫ জন। একই ওয়ার্ডের প্রাতা পাড়ার একটি পরিবারের সদস্য তিনজন। তিন পরিবারের মোট সদস্যসংখ্যা ১৮ জন। তাদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও রয়েছে।

সোমবার সকালে বাকলাই সাব-জোন ক্যাম্প অধিনায়ক ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ দুই বছর পর স্বদেশে ফিরে এসে পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে আবেগঘন হয়ে ওঠে শিশুদের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়ার দৃশ্য। ছোট্ট হাতে জাতীয় পতাকা, চোখেমুখে বিস্ময় আর চারপাশে নিজের দেশের মানুষ—দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর যেন তারা নতুন করে নিজেদের স্বদেশকে আবিষ্কার করেছে।

সেনাবাহিনীর সহায়তায় মিজোরাম থেকে স্বদেশে ফিরলেন ৩ বম পরিবার, হাতে বাংলাদেশের পতাকা

প্রায় দুই বছর আগে নিরাপত্তাজনিত কারণে সীমান্ত পেরিয়ে অচেনা পরিবেশে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো এবার ফিরে এসেছে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে। তাদের এই প্রত্যাবর্তন শুধু তিনটি পরিবারের ঘরে ফেরার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেকড়ের টান, স্বদেশের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা এবং নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যাশা।

দীর্ঘদিন মিজোরামে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার পর বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসা বম শিশুদের হাতে জাতীয় পতাকার দৃশ্যটি তাই হয়ে উঠেছে ঘরে ফেরার প্রতীক। তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং নতুন করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তরিক সহযোগিতা ও মানবিক উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। দুর্গম পার্বত্য এলাকার বাস্তবতায় নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আস্থা তৈরি করা এবং বিপথে বা অনিশ্চয়তায় চলে যাওয়া পরিবারগুলোকে স্বদেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের পরিবেশ তৈরিতে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্বদেশে ফিরে আসা পরিবারগুলোর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন সহায়তায় সবসময় প্রস্তুত থাকার কথাও জানানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তিন বম পরিবারের এই প্রত্যাবর্তন শুধু স্বজন ও স্বদেশের কাছে ফিরে আসার আনন্দই নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে আস্থা, মানবিকতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed