পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শাসনের ২ মাসেই খ্রিস্টানদের ওপর অন্তত ১৫ হামলা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শাসনের ২ মাসেই খ্রিস্টানদের ওপর অন্তত ১৫ হামলা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শাসনের ২ মাসেই খ্রিস্টানদের ওপর অন্তত ১৫ হামলা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও নানাবিধ হয়রানির ঘটনা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গত জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে রাজ্যজুড়ে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর অন্তত ১৫টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। চার্চ ভাঙচুর, প্রার্থনায় বাধা, যাজক ও পুণ্যার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং ধর্মীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানোর মতো একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে।

খ্রিস্টান অধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হাওড়া ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকে এসব ঘটনার খবর এসেছে।

‘অ্যান্টি-খ্রিস্টান ট্র্যাকার ওয়াচ’ (এসিটি ইন্ডিয়া) জুলাই মাসে রাজ্যে ৯টি হামলার তথ্য উল্লেখ করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও স্থানীয় উৎস থেকে অন্তত ৮টি স্পষ্ট ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেছে।

৪ জুলাই (পশ্চিম মেদিনীপুর): পালবাড়িতে এক নবদম্পতির ঘরোয়া প্রার্থনা সভায় হামলা চালিয়ে নারী অতিথিদের শাখা-পলা মুছে ফেলার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে স্থানীয় যাজককে আটক করে।

৫ জুলাই (দক্ষিণ ২৪ পরগনা): সুভাষগ্রামে এক চিকিৎসাধীন গির্জায় প্রায় ১০০ জনের একটি দল হামলা চালায়। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে অলটার, বাদ্যযন্ত্র ও ছাদের ৩টি ক্রস ভেঙে ফেলা হয়। ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলে হামলাকারীরা। পরবর্তীতে পুলিশ ৩ জনকে আটক করে।

৫ জুলাই (পূর্ব বর্ধমান ও অন্যান্য): ফরিদপুরের গ্রেস চার্চে রবিবার প্রার্থনার সময় যাজক ও প্রার্থনাকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। একই দিনে মুর্শিদাবাদে এক খ্রিস্টান বিধবাকে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য চাপ ও জমি দখলের চেষ্টা এবং বাঁকুড়ায় একটি প্রার্থনা সভায় বাধা দিয়ে বাইবেল বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগ ওঠে।

১২ জুলাই (উত্তর ২৪ পরগনা): বারাসাতে সেলেসিয়ান সিস্টারদের নির্মাণাধীন একটি স্মারক চ্যাপেল ও কবরস্থান ভেঙে ফেলার দাবিতে প্রায় ৬০ জনের একটি দল হুমকি দেয়।

২৬ ও ৩১ জুলাই: দক্ষিণ ২৪ পরগনার চাড়ারায়পুর মাজিরপাড়ায় ঘরোয়া প্রার্থনায় বাইবেল পোড়ানো ও গেরুয়া রং মাখিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ৩০ জুলাই সন্দেশখালিতে এক যাজককে হুমকির মুখে পড়তে হয়।

আগস্ট মাসে ঘটনাগুলোর ধরন বদলে মূলত বাসাবাড়িতে আয়োজিত প্রার্থনাসভাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

১৪ আগস্ট (পূর্ব বর্ধমান): সহানগরে এক খ্রিস্টান নারীর দাফনকালে জমি সংক্রান্ত বিরোধ তুলে কবর থেকে লাশ তুলতে বাধ্য করার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। পরে অন্য এক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। পুলিশ অবশ্য মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে জমির স্বত্ব সংক্রান্ত স্থানীয় বিরোধ বলে দাবি করেছে।

২৩ আগস্ট (হাওড়া): উলুবেড়িয়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে প্রার্থনার সময় প্রায় ৬০ জন পুণ্যার্থীর ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। যাজক ও প্রার্থনাকারীদের মারধর করে আসবাবপত্র ও সাউন্ড সিস্টেম ভাঙচুর করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে এবং এফআইআর দায়ের হয়।

২৫, ২৬ ও ৩০ আগস্ট: হাওড়ার ঘুসুড়ি ও জগদ্বল্লভপুর, পূর্ব মেদিনীপুরের চেক মাইলপোস্ট এবং উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে ঘরোয়া প্রার্থনাসভায় হামলা, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের খবর পাওয়া যায়।

ধর্মান্তরের অভিযোগ ও খ্রিস্টান সমাজের আতঙ্ক

অধিকাংশ ঘটনার পেছনেই হামলাকারীদের মূল অভিযোগ ছিল ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ’। তবে এই অভিযোগের কোনো আইনি ভিত্তি বা তদন্তমূলক সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর হাওড়া ও অন্যান্য জেলার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তার অভাবে সাময়িকভাবে বাসাবাড়িতে প্রার্থনাসভা ও যাজকদের গৃহপরিদর্শন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

কিছু ঘটনায় পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ ও এফআইআর হলেও অনেক ঘটনায় এখনো কোনো গ্রেপ্তার ঘটেনি। মানবাধিকার ও ধর্মীয় সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘর্ষ নাকি সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত চাপ—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed