‘সবই আসবে, সবই হবে—শুধু আসবে না আমার ছোট ছেলে ট্রোম্যান’
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাঙামাটির তাঁর বাড়িতে। প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা গঙ্গাদেবী খীসা। ছেলের রেখে যাওয়া ছবিটি বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন তিনি। স্বজনদের অপেক্ষা এখন শুধু কফিনবন্দি মরদেহ দেশে ফেরার।
গত ২০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ট্রোম্যান খীসা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। পরিবারও সেই অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সেই ফেরা আর জীবিত অবস্থায় হলো না। ডিসেম্বরের পরিবর্তে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরবেন পরিবারের উপার্জনক্ষম এই সদস্য।

বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) ট্রোম্যান খীসার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা গঙ্গাদেবী খীসা। ছেলের সঙ্গে কাটানো সময়, তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আর পরিবারের জন্য করা নানা প্রতিশ্রুতির কথা মনে করে বিলাপ করছিলেন তিনি। মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে গঙ্গাদেবী খীসা বলেন, ‘এবারের মিশন শেষ করে এসে পাকা ঘর করবে, বাসায় ওয়াই-ফাই লাগাবে, এলইডি টেলিভিশন কিনবে—বলেছিল ট্রোম্যান। হয়তো সবই আসবে, সবই হবে, শুধু আসবে না আমার ছোট ছেলে ট্রোম্যান খীসা।’

ছেলের বলা কথাগুলোই এখন মায়ের কাছে স্মৃতি। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সেই সন্তানই আর ফিরবেন না—এ বাস্তবতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। কখনো ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে, আবার কখনো ছবিটি বুকে চেপে ধরে বিলাপ করছেন মা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন ট্রোম্যান খীসা। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষিণ সুদানে যান তিনি। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই মিশন শেষ করে দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আকস্মিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে গেল তাঁর সেই অপেক্ষা।

ট্রোম্যান খীসার বাবা সুবিমল খীসা জানান, পরিবারের প্রতি তাঁর ছেলের দায়িত্ববোধ ছিল গভীর। প্রতি মাসে অগ্রিম বাজার খরচ দিয়ে রাখতেন ট্রোম্যান। পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতেন তিনি। পরিবারের অর্থনৈতিক ভার অনেকটাই তাঁর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ছেলেকে হারানোর পাশাপাশি এখন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাবা সুবিমল খীসা। তিনি বলেন, ট্রোম্যানের মৃত্যুর সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত আয়ের একটি বড় পথও বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সুবিমল খীসা সরকারের কাছে তাঁর পুত্রবধূ, অর্থাৎ ট্রোম্যান খীসার সহধর্মিণীর জন্য একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করার দাবি জানান। তাঁর ভাষ্য, ছেলের অনুপস্থিতিতে পরিবারকে সচল রাখা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সহযোগিতা পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

স্বজনরা জানান, ট্রোম্যান খীসার দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। মিশন শেষে ডিসেম্বরেই প্রিয় মানুষটি বাড়িতে ফিরবেন—এমন স্বপ্ন ছিল তাঁদের। এখন সেই অপেক্ষার অর্থ বদলে গেছে। জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফেরার পরিবর্তে কফিনবন্দি হয়ে ফিরবেন ট্রোম্যান। প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে তাই পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন যুক্ত হয়েছে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতিগুলোর স্মৃতি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে ট্রোম্যান খীসার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। প্রিয় সন্তান ও পরিবারের অন্যতম ভরসার মানুষকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ পরিবার এখন তাঁর মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।