রাঙামাটিতে ১৪৯ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মানবেতর জীবনযাপন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ের বুকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিলেও সমতলের তুলনায় রাঙামাটি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো নানা সীমাবদ্ধতায় পিছিয়ে রয়েছে। জেলার ৭৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭০৭টি সরকারি হলেও ১৪৯টি বিদ্যালয় এখনো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে থাকা এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল সম্মানী ও আর্থিক সংকটের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি চাষাবাদ, টিউশনি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে কোনোভাবে সংসার ও বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
জেলার প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে এসব বিদ্যালয় বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সরকারি আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত। ফলে অনেক বিদ্যালয় নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে। রাঙামাটির এ পরিস্থিতিকে স্থানীয়রা ‘বাতির নিচেই অন্ধকার’-এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
রাঙামাটি পৌরসভার একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল সিলেটি পাড়া। প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস এই জনপদে। এখানে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফলে গত ২৪ বছর ধরে হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছে রাগীব রাবেয়া ফুল কুঁড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির দুই কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় এটিই স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা।
দুই শিফটে পরিচালিত বিদ্যালয়টিতে একজন প্রধান শিক্ষক ও তিনজন সহকারী শিক্ষক নামমাত্র সম্মানীতে পাঠদান করছেন। ২০২২ সালে জেলার বেশ কিছু বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও বাদ পড়ে যায় এই প্রতিষ্ঠানটি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিনা বা অপ্রতুল পারিশ্রমিকে শিক্ষাদান করা শিক্ষকরা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
রাঙামাটি সদরের বসন্ত নিচু পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রমোদ চাকমা বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে ৫২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা বা উপবৃত্তি পায় না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে জেলা পরিষদ থেকে দেওয়া দেড় হাজার টাকা সম্মানীও বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। নিজের সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাব, নাকি স্কুল টিকিয়ে রাখব—বুঝতে পারছি না। সরকার নজর না দিলে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।’
একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন নানিয়ারচর জুমিয়া পুনর্বাসন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণময় তালুকদার। তিনি জানান, বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক পালাক্রমে ক্লাস নেন। জেলা পরিষদের অনুদান বন্ধ থাকায় পরীক্ষার খরচসহ বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে। সংসারের খরচ চালাতে এখন বাড়ির পতিত জমিতে চাষাবাদ করতে হচ্ছে তাদের।
বাঘাইছড়ির অদ্বিতি কেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, বিদ্যালয়টি সেনাবাহিনী পরিচালিত হওয়ায় কিছুটা বেতন পাওয়া যায়। তা না হলে পরিবার নিয়ে চরম সংকটে পড়তে হতো। বাকি সময় টিউশনি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন তিনি।

নানিয়ারচরের দুর্গম এলাকার ত্রিপুরাছড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছোটন চাকমা বলেন, অত্যন্ত দুর্গম ও পশ্চাৎপদ এলাকায় বিদ্যালয়টির অবস্থান। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ এবং শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। সুবিধাবঞ্চিত, পশ্চাৎপদ ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর শিক্ষকরা বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন।
ছোটন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে এসব বিদ্যালয় জাতীয়করণের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দুর্গম, অনগ্রসর ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখতে এসব বিদ্যালয় এবং কর্মরত শিক্ষকদের জাতীয়করণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দুই দফায় রাঙামাটি জেলার ৮১টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। তবে এখনো ১৪৯টি বিদ্যালয় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশ স্থানীয় ব্যবস্থাপনা ও অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জেলা পরিষদের মাধ্যমে কিছু সম্মানী পেতেন, যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কফিল উদ্দিন বলেন, বর্তমানে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সরকারি পাঠ্যবই পেলেও বিদ্যালয়গুলো সরকারি কোনো আর্থিক সুবিধা পায় না। সরকারিভাবে বিদ্যালয় জাতীয়করণের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে সরকার থেকে তথ্য চাওয়া হলে তা পাঠানো হবে।
রাঙামাটি জেলা পরিষদের শিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সায়রা চন্দ্রা চাকমা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মানী বন্ধ হয়ে যায়। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন স্কিমের মাধ্যমে শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে এসব বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অনেক জনপদে সরকারি বিদ্যালয় না থাকায় স্থানীয় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোই শিশুদের শিক্ষার প্রধান ভরসা। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো, শিক্ষকদের সম্মানী, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে বছরের পর বছর সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও যেসব শিক্ষক শিশুদের পাঠদান করে আসছেন, তাদের জীবন-জীবিকা ও বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। সরকারি সহায়তা ও কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে রাঙামাটির দুর্গম অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সহায়তা বাড়ানোর দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।