৩ বাংলাদেশির সাজা বহাল রেখে জরিমানা অনাদায়ের মেয়াদ কমাল ভারতের আদালত

৩ বাংলাদেশির সাজা বহাল রেখে জরিমানা অনাদায়ের মেয়াদ কমাল ভারতের আদালত

৩ বাংলাদেশির সাজা বহাল রেখে জরিমানা অনাদায়ের মেয়াদ কমাল ভারতের আদালত
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

ভারতে অবৈধভাবে বসবাসের দায়ে তিন বাংলাদেশির দুই বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন মাদ্রাজ হাইকোর্ট। তবে বাংলাদেশে অস্থিরতা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে জীবিকা ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তারা ভারতে এসেছিলেন—আদালতের এমন পর্যবেক্ষণের পর ১০ হাজার রুপি জরিমানা অনাদায়ে কারাভোগের মেয়াদ তিন মাস থেকে কমিয়ে এক সপ্তাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৩০ দিনের মধ্যে তাদের বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২৮ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এন. নির্মল কুমার তিন বাংলাদেশি নাগরিকের করা আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। ২০০৪ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তারা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বাংলাদেশে অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের কারণে ওই তিন ব্যক্তি নিজেদের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজের সন্ধানে ভারতে এসেছিলেন। তারা কোনো অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িত ছিলেন না কিংবা এমন কোনো অপরাধে দণ্ডিতও হননি, যার মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে জরিমানা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছেন—এমন প্রমাণও নেই।

মামলাটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তামিলনাড়ুর তিরুপ্পুরে তিন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। ভীরাপান্ডি থানার পুলিশ ইদুভামপালায়াম এলাকায় তাদের দুই শিশুসহ আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা বাংলাদেশি নাগরিক এবং বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা অন্য কোনো ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশের কথা স্বীকার করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়।

আদালতে তারা জানান, ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে তিরুপ্পুরে বসবাস ও কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযুক্তের যমজ দুই ছেলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিরুপ্পুর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জন্ম নেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়ে জীবিকার সন্ধান করেছিলেন বলেও তারা আদালতকে জানান।

মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। বিচারিক আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ ছয়জন সাক্ষীকে হাজির করে এবং ১২টি নথি বা আলামত উপস্থাপন করে। পরে আদালত তিনজনকেই ২০০৪ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের সংশ্লিষ্ট ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে। প্রত্যেককে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার রুপি জরিমানা করা হয়। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত তিন মাসের সাধারণ কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

এই রায়ের বিরুদ্ধে মাদ্রাজ হাইকোর্টে আপিল করেন তিন বাংলাদেশি। তাদের পক্ষে আইনজীবী এম. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও আর. বকিয়ালক্ষ্মী যুক্তি দেন, তারা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত নন, তিরুপ্পুরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও কাজ করেছেন এবং বাংলাদেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত। তাদের আটক ও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন আইনজীবীরা।

তারা আদালতে আরও জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে জীবিকার সন্ধানে বাংলাদেশ থেকে তিরুপ্পুরে গিয়েছিলেন তারা। সীমান্ত অতিক্রমের সময় নিজেদের প্রবেশের বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলেও তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

তবে হাইকোর্ট দেখতে পান, তিনজনই বাংলাদেশের নাগরিক—এ বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বাংলাদেশি ভোটার পরিচয়পত্র, নাগরিকত্বের নথি ও জন্মসনদসহ বিভিন্ন নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে তারা বৈধ ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছিলেন—এ বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালত জানান।

এসব কারণে ফরেনার্স অ্যাক্টের অধীনে তাদের দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের কোনো কারণ দেখেননি বিচারপতি এন. নির্মল কুমার। ফলে তিনজনের দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।

তবে সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেন আদালত। রায়ে বলা হয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে তিরুপ্পুরে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে বানিয়ান কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। তাদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল এবং জরিমানার অর্থ পরিশোধ করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই।

আদালত বলেন, তারা অত্যন্ত দরিদ্র, জীবিকার সন্ধানে দেশান্তরিত হয়েছেন এবং কর্মসংস্থানের আশায় ভারতে এসেছেন। কয়েক বছর ধরে তিরুপ্পুরে অবস্থান করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অন্য কোনো নেতিবাচক তথ্যও পাওয়া যায়নি। এখন তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ১০ হাজার রুপি জরিমানা বহাল রাখলেও তা অনাদায়ে তিন মাসের সাধারণ কারাদণ্ড কমিয়ে এক সপ্তাহ করেছেন আদালত। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তিন বাংলাদেশির প্রত্যাবাসন ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *