আনোয়ার-মিন অং হ্লাইং বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক স্বার্থের অভিযোগ

আনোয়ার-মিন অং হ্লাইং বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক স্বার্থের অভিযোগ

আনোয়ার-মিন অং হ্লাইং বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক স্বার্থের অভিযোগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ উঠেছে। আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসন ইস্যু গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হলেও সমালোচকদের দাবি, মানবাধিকার বা শরণার্থীদের নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং উভয় নেতার নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে বুধবার দুপুরে কুয়ালালামপুরে পৌঁছান। তাঁর এই সফর নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। সফরের প্রথম দিনই তিনি একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবসায়িক সংলাপে অংশ নেন।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আনোয়ার ইব্রাহিম ও মিন অং হ্লাইংয়ের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিয়ানমারের নাগরিকদের ‘স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ’ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আলোচনা হবে। আনোয়ার বলেছেন, মালয়েশিয়া অনির্দিষ্টকাল শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে পারে না এবং নিজেদের নাগরিকদের দায়িত্ব মিয়ানমারকেই নিতে হবে।

তবে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, প্রত্যাবাসনের এই উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। অলটারনেটিভ আসিয়ান নেটওয়ার্ক অন বার্মার (ALTSEAN-Burma) প্রতিষ্ঠাতা ও মানবাধিকারকর্মী ডেবি স্টোথার্ড দ্য ইরাবতীকে বলেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে রাজনৈতিক সংকট চলছে এবং সাধারণ নির্বাচনের আগে আনোয়ার ইব্রাহিমের জনপ্রিয়তা কমছে।

মালয়েশিয়ায় অভিবাসনবিরোধী মনোভাবও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গত সপ্তাহে দেশটি প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছে। এটি আনোয়ার সরকারের ঘোষিত ৫ হাজার নাগরিককে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, শরণার্থী ও অভিবাসীদের কারণে মালয়েশিয়ার ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

তবে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছিল, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৮ হাজার নাগরিক দেশে ফিরে এসেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটির বিভিন্ন অভিবাসন আটককেন্দ্রে ১০ হাজারের বেশি মিয়ানমারের নাগরিক আটক ছিলেন।

তবে প্রত্যাবাসনের তালিকায় রোহিঙ্গারা থাকবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বড় অংশই রোহিঙ্গা।

মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছামূলক হবে বলে দাবি করলেও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর ও বিভিন্ন অধিকার সংগঠন এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে ফিরে গেলে এসব মানুষ নিপীড়ন ও জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ফলে প্রত্যাবাসনে তাঁদের সিদ্ধান্ত আদৌ ‘স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া’ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডেবি স্টোথার্ডের অভিযোগ, আসন্ন নির্বাচনে ভোট পাওয়ার লক্ষ্যেই আনোয়ার ইব্রাহিম শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, মিয়ানমারের জনগণকে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার ‘বিষয় বা জিম্মি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর আগে ২০২৫ সালে আসিয়ান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে মিয়ানমার সংকট সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল আনোয়ারের নেতৃত্বাধীন মালয়েশিয়া। মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনাসহ সংকট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল দেশটি। একই সময়ে জান্তা সরকারের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়ে ডিসেম্বর-জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল মালয়েশিয়া।

কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আনোয়ার ইব্রাহিম মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান। মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে দূরে রয়েছেন। ফলে মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণকে জান্তা সরকারের জন্য আঞ্চলিক স্বীকৃতি পাওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিন অং হ্লাইংয়ের সফর মিয়ানমারের সঙ্গে ‘গঠনমূলক ও নীতিনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার’ সুযোগ তৈরি করবে।

তবে ডেবি স্টোথার্ডের মতে, মিন অং হ্লাইংয়ের মূল লক্ষ্য আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর সরকারকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর এপ্রিল মাসে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর মিন অং হ্লাইংয়ের এটি পঞ্চম আসিয়ান দেশ সফর। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ভবিষ্যতে আসিয়ানের বৈঠকগুলোতে মিয়ানমারের জান্তা নেতৃত্বের অংশগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

মিয়ানমার ও আসিয়ানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ উইন মিন দ্য ইরাবতীকে বলেন, জান্তা সরকারের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ততা তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিসর বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে মিয়ানমারের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর আসিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সংগঠিতভাবে বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে তাঁর মতে, আসিয়ান জোট হিসেবে এখনো জান্তা সরকারকে গ্রহণ না করার নীতি বজায় রেখেছে।

এদিকে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর যোগাযোগ বাড়তে থাকায় দেশটির ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, জান্তা নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ মিয়ানমারের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মিয়ানমারের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকর্মী থিনজার শুনলেই ই দ্য ইরাবতীকে বলেন, অভিযুক্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগ মানবতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, জান্তা সরকারের সঙ্গে পুনরায় সম্পৃক্ততার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে আসিয়ান নেতারা এ বিষয়ে কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *