আলীকদমে পাহাড়ের ঢালে ঢালে কলা চাষ, স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বান্দরবানের আলীকদমে পাহাড়ের ঢাল ও কৃষিজমিতে বাড়ছে কলার আবাদ। কলা চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি পরিবারের প্রান্তিক কৃষকেরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার কলা সরবরাহ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তবে পর্যাপ্ত সার, সরকারি প্রণোদনা ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে সম্ভাবনা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে পারছেন না চাষিরা।
আলীকদম উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে বছরজুড়ে বাংলা, চাপা, সাগর, সরবি ও কাঁচকলার চাষ হয়। তবে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কলার ফলন বেশি পাওয়া যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রোববারেই পানবাজার ও আমতলী নদীঘাট থেকে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ছড়া কলা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কলার এই বাণিজ্য স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ভরিমুখ কর্মকারপাড়া এলাকার দুই তরুণ কৃষক মো. হাসান ও খুরশেদ আলম ১০ একর জমিতে কলা চাষ করেছেন। তাঁরা জানান, প্রতি সপ্তাহে ২০০ থেকে ২৫০টি কলার ছড়া বিক্রি করেন। ছড়াপ্রতি ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যায়। তবে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তাঁদের দাবি, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব।
চাষিরা জানান, পাহাড়ি জমিতে কলা চাষ অনেক পরিবারের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। উৎপাদিত কলা স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি দূরবর্তী জেলাগুলোতেও পাঠানো হয়। এতে কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার পাচ্ছেন। তবে উৎপাদন খরচ, সারসংকট এবং পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তাঁদের লাভের ওপর প্রভাব ফেলছে।
চকরিয়ার ব্যবসায়ী মো. শামশুল আলম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও টোলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কলা পরিবহনে লাভ কমেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, আকার ও গুণগত মানের কারণে পাহাড়ি কলার চাহিদা ভালো।
কৃষকদের মতে, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, সরকারি প্রণোদনা এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে আলীকদমে কলার আবাদ আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এতে একদিকে প্রান্তিক কৃষকদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উৎপাদিত কলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের বর্তমান বাজার ধরে রাখতে পারলে আলীকদমের কৃষি অর্থনীতিতে এ ফসল আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আলীকদমে মোট ১ হাজার ১২৫ হেক্টর কৃষিজমি ও পাহাড়ের ঢালে কলার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা কলা ৬৭৭ হেক্টর, চাপা কলা ৩৫৪ হেক্টর, সাগর কলা ৫২ হেক্টর, সরবি কলা ২৭ হেক্টর এবং কাঁচকলার আবাদ হয়েছে ১৫ হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে বিভিন্ন জাতের কলা উৎপাদনের মাধ্যমে উপজেলার কৃষকেরা স্থানীয় ও দূরবর্তী বাজারের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, ‘পাহাড়ের মাটিতে প্রাকৃতিকভাবেই কলাগাছ বেড়ে ওঠে। শুধু চারার আশপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করা এবং মরা পাতা ও অতিরিক্ত চারা কেটে ফেললেই হয়। সার-কীটনাশক ছাড়া চাষের কারণে এ কলার পুষ্টিগুণ অটুট থাকে, এর চাহিদাও বেশি।’
তিনি আরও বলেন, উপজেলায় সারের চারজন ডিলার থাকলেও বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় কম। তবে সমন্বয়ের মাধ্যমে সব কৃষকের মধ্যে সার বিতরণের চেষ্টা চলছে।
আলীকদমের পাহাড়ি ঢালে কলা চাষের বিস্তার স্থানীয় কৃষির সম্ভাবনাকে তুলে ধরছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত থেকে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি কৃষক পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও জোরদার হতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।