পাহাড়ে কৌশলে তরুণদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর দূরত্ব তৈরি করা হয়েছে- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক বলেছেন, পাহাড়ে যারা সন্ত্রাসে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে তরুণদের সন্ত্রাসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে তরুণদের ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে খাগড়াছড়ি পৌর টাউন হলে পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে যুবসমাজের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তরুণদের উদ্দেশে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, পাহাড়ে কারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, সে সম্পর্কে স্থানীয় অনেকেরই ধারণা রয়েছে। তাঁদের পরিচিতজনদের মধ্যে কেউ কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। তাই শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে পরিবার ও সমাজের মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। যারা বিপথে গেছে, তাদের সন্ত্রাসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে সামাজিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, “পাহাড়ে যারা সন্ত্রাসী, এই যে অস্ত্রের ঝনঝনানি—তাদের বিরুদ্ধে আমরা অপারেশন পরিচালনা করব।” একই সঙ্গে তরুণদের বিপথগামী হওয়া ঠেকাতে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
যুবসমাজের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর দূরত্ব তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলেও তরুণদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, কৌশলে তরুণদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর দূরত্ব তৈরি করা হয়েছে, যাতে উভয় পক্ষের প্রত্যাশা ও অবস্থান সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া না হয়। এ ধরনের দূরত্ব কমাতে যুবসমাজের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তরুণদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক বলেন, নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করা গেলে যারা পাহাড়ে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এজন্য তরুণদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।

পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন এবং একই কর্মস্থলে কাজ করছেন। সেখানে একসঙ্গে চলার ক্ষেত্রে জাতিগত বিভাজন থাকার কথা নয়। তাহলে সমাজে বিভেদ তৈরি হচ্ছে কেন, তা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, “আজকে একটা বাঙালি বন্ধু অসুস্থ হলে কি অবাঙালি বন্ধু এসে রক্ত দেবে না? একটা অবাঙালির যদি রক্তের প্রয়োজন হয়, তাহলে আমি রক্ত দিতে রাজি আছি। সবার রক্তের রং কিন্তু একই।” একই দেশের নাগরিক হিসেবে একে অপরের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ শক্তিশালী হলে পাহাড়ে সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলা সহজ হবে।
দেশের স্বার্থ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি পরিবারের মধ্যেও সমস্যা থাকে। কোনো সন্তান ভুল পথে গেলে তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে না দিয়ে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হয়। একইভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা সমস্যা থাকলেও সেগুলো মোকাবিলা করে সবাইকে দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে। দেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্যের আধিক্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন রিজিয়ন কমান্ডার। তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক মন্তব্যের তুলনায় নেতিবাচক মন্তব্য বেশি দেখা যায়, যা মানুষের হতাশা ও অসন্তোষের প্রতিফলন হতে পারে। জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নৈতিক শিক্ষা থাকলে কেউ অন্যের প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করবে না কিংবা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে না।
মাদক ও অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে কে মাদক গ্রহণ করছে বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তা অনেক সময় বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের জানা থাকে। কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধের অভাবে অনেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চান না। অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা এবং অপরাধ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে অগ্রগতির সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তরুণদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে তারা দেশের উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
পাহাড়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বেকার যুবকদের দলে টানার প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বেকার যুবকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়া, চাঁদাবাজিতে যুক্ত করা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার সুযোগ নেয় সন্ত্রাসীরা। এ পরিস্থিতি থেকে তরুণদের দূরে রাখতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রলোভনে পড়ার আশঙ্কা কমবে। যারা ইতোমধ্যে ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় খাগড়াছড়ি গড়ে তুলতে তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় জানানো হয়, খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন জোনের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি বেকার যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের সনদও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যুবকদের কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাসা থোয়াই মারমা, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনোয়ার সাদাত, পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান এবং মং সার্কেলের সার্কেল চিফ রাজা সাচিং প্রু চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওয়াদুদ ভূইয়া পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখা, বেকারত্ব দূর করা এবং যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, পাহাড়ের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে। তাই তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাদক ও সহিংসতা থেকে দূরে রেখে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের তরুণদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা ও উৎপাদনমুখী কাজে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি জরুরি।
সভায় বক্তারা বলেন, পাহাড়ের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগও তৈরি করতে হবে। পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কারিগরি খাতের স্থানীয় সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব।
বক্তারা আরও বলেন, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভেদ ও সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
মতবিনিময় সভায় যুবসমাজের বিভিন্ন সমস্যা, প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। তরুণদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উপস্থিত বক্তারা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।