গচ্চা গেল ২,৮১১ কোটি টাকা, নষ্ট হলো ১৪ বছর: বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় নেবে কে?
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
ধরুন, আপনি কাপড় কিনে দরজির কাছে গেলেন। পছন্দের একটি নকশা দেখিয়ে কোট বানাতে দিলেন, মজুরিও পরিশোধ করে দিলেন। কিন্তু কোট হাতে পাওয়ার পর দেখলেন, মূল নকশায় মারাত্মক গলদ থাকায় সেটি আর পরার কোনো উপায় নেই। আপনার টাকা ও সময় দুটোই পানিতে গেল, হাতে রইল কেবল এক খরুচে ভুলের মাশুল।
গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের বাস্তবতাও ঠিক তা-ই। ১৪ বছর খোঁড়াখুঁড়ির ভোগান্তি, দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি ও জনগণের চরম দুর্ভোগের পর অবশেষে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এর পেছনে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। পাশাপাশি ঠিকাদারদের বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। অথচ বিশেষায়িত এই বাস সার্ভিস আজ পর্যন্ত একজন যাত্রীও ব্যবহার করতে পারেননি।
এই ব্যর্থতা অত্যন্ত ভয়াবহ, কারণ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প ছিল না। ২০.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে গাজীপুর ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সংযোগকারী প্রধান মহাসড়কের ওপর অবস্থিত। এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটিকে বিআরটি লেনে রূপান্তর করতে গিয়ে ইউটিলিটি স্থানান্তর ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হয়েছে। ফলে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে লাখো মানুষকে।
এ প্রকল্পের মানবিক মূল্যও ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেন থেকে কারের ওপর কংক্রিটের গার্ডার পড়ে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য পিষ্ট হয়ে মারা যান। আর আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার আশায় বছরের পর বছর তীব্র যানজটের কবলে পড়ে নাকাল হয়েছেন অগণিত মানুষ। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত সেবা আর কখনোই আলোর মুখ দেখেনি।
২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে প্রকল্পের ভৌত কাজের ৭৭ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হওয়ার দাবি করা হলেও, শেষপর্যন্ত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরটি প্রকল্প বাতিল করেছে। এর পরিবর্তে করিডোরটিকে প্রথাগত ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি গুটিয়ে ফেলারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রকল্পটি বন্ধের মাধ্যমে হয়তো অর্থের আরও অপচয় রোধ করা গেছে। তবে এই অবকাঠামো পরিত্যক্ত ঘোষণার মধ্য দিয়েই যেন সব শেষ না হয়; বরং এখান থেকেই শুরু হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার কাজ।
হাজার কোটি টাকা অপচয়ের জবাব দেবে কে?
অন্তর্বর্তী সরকার এ প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ আর বাড়াতে রাজি না হওয়ার পর একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়। তাদের পর্যালোচনার পর বিআরটি প্রকল্প বাতিলের এই সিদ্ধান্ত আসে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল মত দেয়, গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়কের মতো অপ্রশস্ত করিডোরে একটি স্বতন্ত্র বিআরটি ব্যবস্থা কখনোই নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তারা আংশিক নির্মিত এই অবকাঠামোকে দূরপাল্লার ও দ্রুতগতির যানবাহনের উপযোগী উন্নত মহাসড়কে রূপান্তর করার সুপারিশ করেন।
সড়কটিকে এভাবে রূপান্তর করার মাধ্যমে হয়তো সামান্যই উপকার মিলবে। কিন্তু এটি এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দেয়: নকশায় এমন মারাত্মক ত্রুটি থাকার পরও নগরের একটি প্রধান পরিবহন প্রকল্প কীভাবে এত দূর এগিয়ে গেল?
প্রকল্পটির ত্রুটি কিন্তু গোপন কিছু ছিল না। ২০২০ সালের শুরুর দিকেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) নকশার গুরুতর ত্রুটি, ঠিকাদারদের নিম্নমানের কাজ ও দুর্বল তদারকি নিয়ে সতর্ক করেছিল। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, সরকারি সংস্থাগুলো কেবল প্রকল্পের অনুমোদন বাগিয়ে নিতে নিয়মিত ‘নিম্নমানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ যুক্ত করে দেয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে সাবেক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও নির্মাণকাজের ব্যাপক বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করেছিলেন। অথচ তা সত্ত্বেও তিনি ‘যেভাবেই হোক’ প্রকল্পটি শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মূলত রাজনৈতিক জেদের বশবর্তী হয়ে একটি ত্রুটিপূর্ণ নকশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হয়। ফলে শুরুর দিকের একটি ভুল শেষপর্যন্ত বিশাল অঙ্কের এক অলাভজনক ব্যয়ে পরিণত হয়। ২০১৬ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে শুরুতে প্রকল্পটির বাজেট ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু দফায় দফায় সংশোধনের পর প্রকল্পটি বাতিল করার আগপর্যন্ত এর প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ঠেকে ২০২৯ সালে।
যৌথ দায়ভার: উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা
বুয়েটের এই মূল্যায়ন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং প্রকল্পের মূল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়নকারী আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কাছে হস্তান্তরের আগে প্রকল্পটি মূলত এডিবির অর্থায়নের উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছিল। এই করিডোরে জায়গার যে মৌলিক সংকট ছিল, তা প্রাথমিক মূল্যায়নের সময়ই ধরা পড়া উচিত ছিল। অ্যাডভান্সড লজিস্টিকস গ্রুপ (এএলজি), বেটস-টিএমবি জেভি, স্মেক ইন্টারন্যাশনাল, সিস্ত্রা ও এইস কনসালট্যান্টসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নের মূল দায়িত্বে ছিল।
এ বিষয়ে টিবিএসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এডিবি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে এএলজি বলেছে, তাদের সমীক্ষাটি করা হয়েছিল অনেক বছর আগে এবং তখন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।
উন্নয়ন সহযোগীরা গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি দক্ষতা ও স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু কারিগরি প্রভাব খাটানোর পাশাপাশি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতাও থাকতে হয়। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা বা বেসরকারি পরামর্শকদের মৌলিক সুপারিশগুলো যখন বাস্তবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তখন কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের অনুমোদন থাকার অজুহাতে তারা জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে পারে না।
একইভাবে, ঋণদাতা সংস্থার সম্পৃক্ততা ছিল বলেই তৎকালীন সরকারও প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। আবার সরকারের অনুমোদন ছিল বলেই ঋণদাতা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সুপারিশের যৌক্তিকতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্তি পেতে পারে না।
তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোন সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল, কারা সেগুলো নিয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিল কি না, সরকারকে তা খুঁজে বের করতে হবে।
সরকারি বিনিয়োগের জন্য সতর্কবার্তা
বিআরটি ধারণাটি জাতীয় পরিকল্পনায় প্রথম যুক্ত হয় ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) মাধ্যমে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এটি প্রস্তুত করেছিল লুই বার্জার গ্রুপ। পরে এডিবি গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় লাইন-৩-এর প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অর্থায়ন করে। সেখানে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, এই রুটে ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে এবং গাজীপুর থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ২০ মিনিট।
পরে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ করে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এর উদ্যোক্তা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পায়। শুরুতে ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ সরকারের দেওয়ার কথা ছিল এবং এডিবি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ৭০৭ কোটি টাকার।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সেই প্রক্ষেপণের সম্পূর্ণ বিপরীত। তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ পরবর্তীকালে এই প্রকল্পটিকে ‘দানবীয় ও অপরিকল্পিত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বর্তমান সরকার একটি ব্যর্থ প্রকল্পের পেছনে নতুন করে ভালো অর্থ ঢালার চিরায়ত ফাঁদে পা না দিয়ে বিনিয়োগ বন্ধ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এখন করদাতাদের অর্থেই করিডোরটিকে সাধারণ সড়কে রূপান্তর করতে হবে। একইসঙ্গে পরিশোধ করতে হবে এডিবি ও ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি-র ছাড় করা ২৫৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক ঋণের বোঝা।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যর্থতা এড়াতে সরকারকে প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রজুড়ে আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। প্রাথমিক অনুমোদন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার যথার্থতা, ঠিকাদার নির্বাচন ও ত্রুটি জানা সত্ত্বেও বারবার মেয়াদ বাড়ানোর মতো প্রতিটি বিষয় এই তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
যেকোনো বড় সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য বিচার করতে হবে জনগণ তা থেকে কতটা সুফল পেল তার ওপর ভিত্তি করে—কত টাকা খরচ হলো বা ভৌত অগ্রগতির পরিসংখ্যান কী বলছে, তা দিয়ে নয়। গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্প তার নিজস্ব ত্রুটিপূর্ণ অনুমানের ভারেই ভেঙে পড়েছে। ভবিষ্যতে জনগণের অর্থের সুরক্ষা দিতে হলে এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিকল্প নেই।
তা না হলে এর শিক্ষাটি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ: প্রকল্প পরিত্যক্ত হবে, অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়া হবে এবং সরকারি পরিকল্পনা নতুন করে লেখা হবে; কিন্তু ব্যর্থতার মূল কারিগরেরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে, আর মাঝখান থেকে এর চড়া মূল্য চোকাবে সাধারণ মানুষ।
-টিবিএস।