আসিয়ান বিশেষ দূতের মিয়ানমার সফরের মধ্যেই জান্তাবাহিনীর বিমান হামলা, চার দিনে নিহত ১৬

আসিয়ান বিশেষ দূতের মিয়ানমার সফরের মধ্যেই জান্তাবাহিনীর বিমান হামলা, চার দিনে নিহত ১৬

আসিয়ান বিশেষ দূতের মিয়ানমার সফরের মধ্যেই জান্তাবাহিনীর বিমান হামলা, চার দিনে নিহত ১৬
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

রাখাইনে ক্লাস্টার বোমার আঘাতে শিশুসহ নিহত ৫, মাতৃসদন ধ্বংস; কারেন্নিতে স্কুলে হামলায় নিহত ৩ শিশু, আহত ৮

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারে আসিয়ানের বিশেষ দূত মানবিক সফরে থাকা অবস্থায়ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে দেশটির সামরিক জান্তা সরকার। গত চার দিনে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৯টি বিমান হামলায় ১৬ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। হামলার অর্ধেকের বেশি চালানো হয়েছে রাখাইন রাজ্যে, যার প্রায় পুরো এলাকা বর্তমানে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণে।

গত ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত আসিয়ানের বিশেষ দূত মারিয়া তেরেসা লাজারো দক্ষিণ শান রাজ্যের রাজধানী তাউংগিতে মানবিক সফর করেন। সফরকালে তিনি জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন। তবে তাঁর এ সফরের মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত জান্তা বাহিনী অন্তত ৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ১৬ জন নিহত ও ৫১ জন আহত হয়েছেন।

রোববার (১ নভেম্বর) রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিমান হামলা চালায় জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমান। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল চীনের সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প ও গ্যাস পাইপলাইনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কিয়াউকফিউ এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন কিয়াউকতাও, পাউকতাও ও ম্রাউক-উ শহর।

ম্রাউক-উ শহরে একটি অস্থায়ী মাতৃসদনে ক্লাস্টার বোমা হামলায় এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত এবং নয়জন আহত হয়েছেন। হামলায় মাতৃসদনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত ১০ ডিসেম্বর জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় ম্রাউক-উ জেলা হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বিকল্প হিসেবে ওই অস্থায়ী মাতৃসদনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আগের ওই হামলায় হাসপাতালের অন্তত ৩৩ জন রোগী, রোগীর স্বজন ও চিকিৎসাকর্মী নিহত এবং প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছিলেন।

আরাকান আর্মির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোববার রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় মোট ১২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ৩২ জন আহত হয়েছেন।

এর দুই দিন আগে আরাকান সিভিল সোসাইটি চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনস (এসিএসও) এবং রাখাইনের ৭০টি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের একটি জোট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আসিয়ান, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতি রাখাইন রাজ্যে নো-ফ্লাই জোন কার্যকর করার আহ্বান জানায়। বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা বন্ধে এ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানায় সংগঠনগুলো।

এদিকে, কারেন্নি রাজ্যের লোইকাও শহরেও জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোববার ওয়ানগাউট গ্রামের একটি স্কুলে দুটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-১২ বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ওই সময় স্কুলটিতে শিশুদের ছুটিকালীন খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল। হামলায় তিন শিশু নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছে।

জান্তা সরকারের আঞ্চলিক পর্যায়ে পুনঃসম্পৃক্ততার উদ্যোগের মধ্যে বিমান হামলা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। আসিয়ানের বিশেষ দূত মারিয়া তেরেসা লাজারো মিয়ানমারে পৌঁছানোর দিনই সাগাইং অঞ্চলের চাউং-উ টাউনশিপের তাওকিয়াউংলে গ্রামের একটি মঠে বোমা হামলা চালানো হয়। ওই সময় মঠটিতে প্রায় ৬০ জন উপাসক পাথান পাঠে অংশ নিচ্ছিলেন। হামলায় ৫৭ বছর বয়সী এক বৌদ্ধ ভিক্ষু আহত হন।

একই দিন চিন রাজ্যের হাখা শহরে সাবেক একটি যুদ্ধবন্দিশিবিরেও বোমা হামলা চালানো হয়। তবে ওই ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) সাগাইং অঞ্চলের হোমালিন টাউনশিপের থায়েজালাউক গ্রামের একটি মঠে স্থাপিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বিমান হামলা চালায় জান্তা বাহিনী। এতে বাস্তুচ্যুত সাতজন আহত হন। স্থানীয় জান্তা সামরিক চৌকি প্রতিরোধী বাহিনীর দখলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর এ হামলা চালানো হয়।

সাগাইংয়ের সালিংগি টাউনশিপের দুতাউক গ্রামেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে দুটি গাইরোকপ্টার থেকে হামলা চালানো হলে এক নারী নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন। ওই এলাকায় তখন কোনো ধরনের স্থলযুদ্ধ বা সংঘর্ষ চলছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আসিয়ানের বিশেষ দূতের সফরকে কেন্দ্র করে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, বেসামরিক মানুষের ওপর প্রতিদিনের হামলা ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা আড়াল করে জান্তা সরকার নিজেকে সহযোগিতাপ্রবণ ও মানবিক মনোভাবাপন্ন প্রশাসন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের সফরকে জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারে।

এদিকে, মিয়ানমারের সমান্তরাল জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৪৬৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

আসিয়ানের বিশেষ দূতের সফরের সময়েও বিভিন্ন অঞ্চলে বেসামরিক স্থাপনা ও আশ্রয়কেন্দ্রে হামলার এসব ঘটনা মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের মানবিক পরিস্থিতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed