রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি মিয়ানমারের, প্রতিবাদ গণমাধ্যমের

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি মিয়ানমারের, প্রতিবাদ গণমাধ্যমের

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি মিয়ানমারের, প্রতিবাদ গণমাধ্যমের
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকারের ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে তাদের ‘বাঙালি’ বলে আসছে দেশটির সামরিক সরকার।

এবার মালয়েশিয়ায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল নিউজ এশিয়ার (সিএনএ) সমালোচনা করেছে মিয়ানমার সরকার। তবে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় ব্যবহারের পক্ষে অনড় রয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

গত ২২ অক্টোবর মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে সিঙ্গাপুরে অবস্থিত দেশটির দূতাবাস। এতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়, মিয়ানমারে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিসত্তার অস্তিত্ব কখনো ছিল না।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের আদমশুমারিসহ ঐতিহাসিক সরকারি নথিতে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের উল্লেখ রয়েছে। তাই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করে মিয়ানমার সরকার।

অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকারের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে সিএনএ। সংবাদমাধ্যমটির নির্বাহী প্রযোজক ড্যানিয়েল হেং বলেন, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে, এটি সাংবাদিকতার স্বীকৃত চর্চারও অংশ বলে দাবি করেন তিনি।

হেং আরও বলেন, জাতিসংঘ, ইউনিসেফ, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় ব্যবহার করে।

পাশাপাশি বিবিসি, সিএনএন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স ও এএফপির মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এই পরিচয় ব্যবহৃত হয়।

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদন প্রচার করে সিএনএ। সংবাদমাধ্যমটির সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘ইনসাইট’-এ গত ১৫ অক্টোবর ‘ইনসাইট: মালয়েশিয়াস রোহিঙ্গা রিডল’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রচারিত হয়।

পরদিন এটি সিএনএ ইনসাইডারের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে মালয়েশিয়ার মানবিক বিবেচনা ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। একসময় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও এখন দেশটিতে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ছেন তারা। তাদের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।

সিএনএর নির্বাহী প্রযোজক ড্যানিয়েল হেং বলেন, প্রামাণ্য প্রতিবেদনটিতে মিয়ানমার সরকারের অবস্থানও যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেশটির কর্তৃপক্ষ ও জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হেং জানান, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ ও জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই রোহিঙ্গা পরিচয় অস্বীকার করে। তারা এই জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা সাম্প্রতিক অভিবাসী হিসেবে পরিচয় করাতে চায় মিয়ানমার।

মালয়েশিয়া থেকে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে বলে সিএনএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ তথ্যের সূত্র হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তার ওই বক্তব্য প্রকাশ করে দেশটির সংবাদমাধ্যম নিউ স্ট্রেইটস টাইমস (এনএসটি)।

আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে দেশটি মালয়েশিয়া থেকে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। তার এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি প্রামাণ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরে সিএনএ।

তবে, মালয়েশিয়া থেকে সম্প্রতি ফিরিয়ে নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিকের মধ্যে কোনো রোহিঙ্গা ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে আলাদা বলে জানানো হয়।

অন্যদিকে, বিদেশে সমস্যায় পড়া নিজেদের নাগরিকদের সহায়তা করা এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার সরকার।

তাদের একটি বিবৃতিতে দাবি করা হয়, যাচাই-বাছাই শেষে প্রতি সপ্তাহে আকাশপথে ৮ হাজার ৪১ জন মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বিমানভাড়া বহনে অক্ষম ১ হাজার ৪৭৬ জনকে নৌবাহিনীর জাহাজে করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

এদিকে, সিএনএর প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। এ ধরনের সম্প্রচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত মিয়ানমারের দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জাও মিন অং সিএনএর প্রধান সম্পাদকের কাছে একটি প্রতিবাদপত্রও পাঠিয়েছেন। এতে প্রতিবেদনটিতে যাচাই না করা তথ্য ব্যবহার এবং মালয়েশিয়ার বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ করা হয়।

তবে, নিজেদের প্রতিবেদন থেকে সরে আসেনি সিএনএ। ড্যানিয়েল হেং বলেছেন, নির্ভরযোগ্য সূত্র ও প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে মিয়ানমার সরকারের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে বলে জানায় সংবাদমাধ্যমটি।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। এরপর থেকে দেশটিতে সামরিক শাসন চলছে।

একই সঙ্গে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে দেশটির বিরুদ্ধে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তাদের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মিয়ানমার সরকারের অস্বীকৃতি তাদের জাতিগত পরিচয় বদলে যাবে না বলে মনে করে সংবাদমাধ্যমটি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *