অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নে আটকে আছে কেএনএফের সাথে শান্তির আলোচনা - Southeast Asia Journal

অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নে আটকে আছে কেএনএফের সাথে শান্তির আলোচনা

অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নে আটকে আছে কেএনএফের সাথে শান্তির আলোচনা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

বান্দরবানের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সঙ্গে শান্তি আলোচনা আটকে যাচ্ছে প্রধানত অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নে। সংগঠনটি বলছে, তারা অস্ত্রসমর্পণ করলে মগ পার্টি, ইউপিডিএফ এবং জেএসএসসহ অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তবে বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লার নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি কেএনএফকে আশ্বস্ত করেছে, কেএনএফ শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসে অস্ত্র সমর্পণ করলে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দেবে।

অস্ত্র সমর্পণ ছাড়াও কেএনএফের আরও কিছু দাবি রয়েছে। কেএনএফের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় সরকারিপক্ষে যুক্ত থাকা সদস্যদের একজন গত সোমবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘কেএনএফ আলোচনার শুরুতে ছয়টি দাবি উত্থাপন করেছিল। এর মধ্যে প্রথম দাবিটি ছিল পৃথক রাজ্য গঠনের বিষয়ে। শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির পক্ষ থেকে কেএনএফ সদস্যদের এ বিষয়ে বিশদ বোঝানো হয়।’ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্যে আলাদা একটি রাজ্য গঠনের সুযোগ নেই বলে তাদের বোঝানো হয়।

এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে কেএনএফের পক্ষে সংগঠনটির স্বঘোষিত ক্যাপ্টেন ফ্লেমিং নামধারী এক ব্যক্তি বিবৃতিতে বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই। কেএনএফ সেনাবাহিনীকে সম্মান প্রর্দশনপূর্বক জানাতে চায় যে, কুকি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে আপনাদের সহযোগিতার কথা আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।’ এই বিবৃতিকে সরকারপক্ষ আলোচনায় অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। কারণ অতীতে সংগঠনটির বিবৃতির ভাষা এমন ছিল না। সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, ‘সম্প্রীতির বান্দরবান অঞ্চলে যেন কেউ সাম্প্রদায়িকতা তৈরি করতে না পারে, এর জন্য বান্দরবানের সব সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাই।’

কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট আত্মপ্রকাশ করে ২০২২ সালের মে মাসে। নিজেদের ডেরা তারা জঙ্গি প্রশিক্ষণের জন্য ভাড়া দেয়। পরে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালিয়ে সেই ডেরা থেকে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার ও প্রশিক্ষণের সরঞ্জাম জব্দ করে। আবার পৃথক রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে কেএনএফ আলোচনায় আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাথান বম কেএনএফের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার স্ত্রী লাল সম কিম বম রুমা সরকারি হাসপাতালের সিনিয়র নার্স পদে কর্মরত রয়েছেন। আন্দোলন শুরুর পর থেকে নাথান বম ঘরে অবস্থান করছেন না বলে জানিয়েছেন নাথান বমের স্ত্রী।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়ন, বান্দরবান জেলার রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকায় তৎপরতা শুরু করে সশস্ত্র কেএনএফ। তারা বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমি, খেয়াং ও ম্রোসহ ছয়টি জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করছে বলে জানায়। ২০২২ সালের ২২ অক্টোবর থেকে গত বছরের ২০ জুন পর্যন্ত রুমা, রোয়াংছড়ি এবং থানচি উপজেলায় তাদের অতর্কিত হামলায় চার সেনাসদস্যসহ ১৭ জনের মৃত্যু হয়। সংগঠনটি সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধও করেছে। সংঘাতের কারণে ওইসব উপজেলার অনেক অধিবাসী নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তা ছাড়া সংগঠনটি অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে ১২টি। এসব ঘটনায় সাতটি মামলা হয়েছে। সব মামলায় নাথান বমসহ সংগঠনটির প্রায় ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার হয় ৪৭ জন।

এসব ঘটনার জেরে ২০২৩ সালের ৩০ মে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধি নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটির প্রধান পাবর্ত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যা শৈ হ্লা। ১৮ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই কেএনএফর সঙ্গে প্রথম দফায় ভার্চুয়াল বৈঠক করে। গত নভেম্বর সরাসরি বৈঠকে বসে উভয় পক্ষ। ওই বৈঠকে উভয়পক্ষে ইতিবাচক আলোচনার পর পরিস্থিতি শান্ত ছিল। এ সময়ের মধ্যে পাবর্ত্য জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে পর্যটক যাতায়াতের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয় প্রশাসন। এই ‘শান্তিময়’ সময়ের মধ্যেই ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচ দিন অশান্ত সময় গেছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি রুমা উপজেলার রিজুক পাড়ায় উহ্লাচিং মারমা নামের এক ব্যক্তিকে জেএসএস সদস্য সন্দেহে গুলি করে হত্যার চেষ্টা হয়। গুলিবিদ্ধ উহ্লাচিং এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় কেএনএফকে দায়ী করে রুমা বাজারে স্থানীয়রা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। সেই কর্মসূচি চলাকালে বম ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এর জেরে কেএনএফ ১৮ ফেব্রুয়ারি সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া ১৮ ফেব্রুয়ারি রুমা বাসস্টেশনের লাইনম্যান লু প্রু মারমাকে কেএনএফ সদস্যরা বেধড়ক পিটুনি দেয়। লু প্রু মারমা রুমা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমার ছোট ভাই। গাড়ি চলাচল বন্ধ হওয়ার পরপরই কেএনএফর সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির লোকজন যোগাযোগ করেন। প্রকাশ্যে বৈঠক করেন চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সৈয়দ মাহবুবুল হক। আলোচনার পর ওই রাতে কেএনএফের পক্ষের ক্যাপ্টেন ফ্লেমিং একটি বিবৃতিতে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানান। পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আজ ২২ ফেব্রুয়ারি জুম’র মাধ্যমে বৈঠকের কথা রয়েছে বলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন। এর আগে গত ৫ নভেম্বর ওই পাড়ায় সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মার্চের প্রথম সপ্তাহে আবার সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার পর উভয়পক্ষ ইতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে বলে আশা করছে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। কমিটির মুখপাত্র বান্দরবান জেলা পরিষদ সদস্য কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অচিরেই কেএনএফের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।’

কেএনএফ দাবি করছে, ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তিতে বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমি, খেয়াং ও ম্রো এই ছয়টি গোষ্ঠীকে বঞ্চিত করেছেন জনসংহতি সমিতি। শান্তি চুক্তির কোনো সুবিধা না পাওয়ায় তারা নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে। রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি না মানলেও সরকারের বর্তমান শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি তাদের চাকরিসহ বিভিন্ন সুবিধা দিতে চাইছে বলে কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন।

  • পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।