লক্ষীছড়ি জোনের একটি উদ্যোগে বদলে গেল ৪ গ্রামের সাড়ে ১৭’শ পাহাড়ি মানুষের জীবন

লক্ষীছড়ি জোনের একটি উদ্যোগে বদলে গেল ৪ গ্রামের সাড়ে ১৭’শ পাহাড়ি মানুষের জীবন

লক্ষীছড়ি জোনের একটি উদ্যোগে বদলে গেল ৪ গ্রামের সাড়ে ১৭’শ পাহাড়ি মানুষের জীবন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝিরির পানিই ছিল একসময় জীবনধারণের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী ও শিশুদের কাঁধে কলসি, হাতে হাঁড়ি—পাহাড়ি পথ বেয়ে পানি সংগ্রহই ছিল তাদের নিত্যদিনের সংগ্রাম। নিরাপদ পানির অভাবে নানাবিধ রোগবালাই তথা স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল নিত্যসঙ্গী। অবশেষে সেই দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান ঘটাল লক্ষীছড়ি জোনের একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক প্রচেষ্টায় খাগড়াছড়ি লক্ষীছড়ি উপজেলার দুর্গম কালাপাহাড় রেঞ্জের চারটি গ্রামের ১ হাজার ৭৫০ জন পাহাড়ি মানুষের জীবনমান বদলে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কর্তৃক গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৮ অক্টোবর থেকে ওই এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান শুরু হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে বর্মাছড়িতে অস্থায়ী পেট্রোল বেস স্থাপনকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠী নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালালেও নিরাপত্তা বাহিনী দৃঢ় অবস্থানে থেকে অভিযানিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এই অভিযান চলাকালেই সেনা সদস্যদের চোখে পড়ে পাহাড়ের আরেক বাস্তবতা—কালাপাহাড় রেঞ্জের দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী মানুষের তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট। পাহাড়ি ঝিরি থেকে সংগ্রহ করা অপরিশোধিত পানির ওপর নির্ভর করে চলছিল তাদের দৈনন্দিন জীবন। শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া- যা ছিলো এক বিভীষিকার গল্প।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে লক্ষীছড়ি জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ তাজুল ইসলাম সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন, অভিযানের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসবেন। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় একটি বৃহৎ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প।

সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে এবং গুইমারা রিজিয়নের ব্যবস্থাপনায় গত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। উদ্দেশ্য একটাই—চারটি দুর্গম পাড়া- হাতিছড়া পাড়া, ইন্দ্রসিংপাড়া, শুকনাছড়ি ও পাঙ্কু পাড়াকে একীভূত করে নিরাপদ পানির স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা।

ঘন বনাঞ্চল, উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ আর দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যেও লক্ষীছড়ি জোনের সেনা সদস্যরা পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাহাড়ের বুক চিরে স্থাপন করা হয় প্রায় ২২ হাজার ২০০ ফিট বা ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পানি সরবরাহ লাইন। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় মোট ৮টি পানির রিজার্ভ ট্যাংক।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই পুরো প্রকল্পে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত কাজের পাশাপাশি কঠোর শারীরিক শ্রমও দিয়েছেন সেনা সদস্যরাই। কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নয়, নিজেরাই কাঁধে করে পাইপ টেনেছেন পাহাড়ি পথে।

২৪ পদাতিক ডিভিশনের সম্পূর্ণ অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ২০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার ফলে চারটি দুর্গম গ্রামের মোট ৩৭৬টি পরিবার—অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৭৫০ জন মানুষ এখন নিয়মিত নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা পাচ্ছেন।

লক্ষীছড়ি জোনের একটি উদ্যোগে বদলে গেল ৪ গ্রামের সাড়ে ১৭’শ পাহাড়ি মানুষের জীবন
নিরাপত্তা অভিযানের মধ্যেই মানবিক উদ্যোগ: দুর্গম কালাপাহাড় রেঞ্জে সেনাবাহিনীর বিশুদ্ধ পানির প্রকল্প

আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি ২০২৫) সকালে স্থানীয়দের নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির প্রকল্প উদ্বোধন করেন জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ তাজুল ইসলাম।

এর মাধ্যমে এক অসাধ্য সাধন হলো। দীর্ঘদিন পানির কষ্ট লাঘব হলো হাজারো মানুষের।

এসময় জোনের পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, ইন্দ্রসিং পাড়া সেনা ক্যাম্প কমান্ডার, লক্ষীছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, স্থানীয় হেডম্যান-কার্বারী, গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও কয়েকশ উপকারভোগী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে পানি সংগ্রহ করতে দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হতো। এখন সেই সময় কাজে, শিক্ষায় ও পরিবারে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে। শিশুদের অসুস্থতা কমেছে, নারীদের কষ্ট লাঘব হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসী প্রভাব ও চাপের কারণে এই এলাকার মানুষ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এমন বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ শুধু পানি সরবরাহ প্রকল্প নয়, বরং রাষ্ট্রের উপস্থিতির একটি শক্ত বার্তা হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

সূত্র বলছে, সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে কেবল সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাই নয়, বরং স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বহু সম্ভাবনার অঞ্চল। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করাও জরুরি। লক্ষীছড়ি জোনের এই একটি উদ্যোগ প্রমাণ করেছে—সঠিক সিদ্ধান্ত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে পাহাড়ের চারটি গ্রামের হাজারো মানুষের জীবন একসঙ্গে বদলে দেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পাহাড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এই সমন্বিত পথচলাই বদলে দিতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *