বাংলাদেশ-ইরাকের নাম ভাঙিয়ে মায়ানমার জান্তাকে জ্বালানি দিচ্ছে ইরান
![]()
নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও ইরাকের বসরা বন্দরকে ইলেকট্রনিক স্পুফিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া যাত্রাপথ হিসেবে দেখিয়ে ইরান থেকে গোপনে জেট ফুয়েল পাঠানো হচ্ছে মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাছে। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে।
ইলেকট্রনিক স্পুফিং হচ্ছে এক ধরনের প্রতারণা যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ভুয়া অবস্থান দেখানো হয়। এদিকে ইরানের জাহাজগুলোর অবস্থান ভুয়া দেখানো হলেও উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়েছে ভিন্ন চিত্র।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই কৌশলে ইরাক ও বাংলাদেশের বন্দরকে কার্যত ভুয়া ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ‘রিফ’ ও ‘নোবেল’ নামের দুটি ট্যাংকার ব্যবহার করে ইরান বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল ও বিস্ফোরক তৈরির উপাদান ইউরিয়া সরবরাহ করছে মায়ানমারের সামরিক বাহিনীকে।
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর পশ্চিম মায়ানমারের চিন প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম ভানহায় সামরিক বিমান থেকে বোমা হামলায় গ্রামের একমাত্র স্কুল ধ্বংস হয়ে যায়। কয়েক মিনিট পর ড্রোন থেকে দ্বিতীয় হামলা চালানো হয়।
এতে দুই শিক্ষার্থী নিহত এবং অন্তত ২২ জন আহত হন বলে জানিয়েছে চিন হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন।
আহতদের একজন জানান, ওই সময় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী স্কুল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করছিল, না হলে হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি হতো।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার আগে ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল পেয়েছিল মায়ানমারের বিমান বাহিনী। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইরান অন্তত ৯টি চালানে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহ করেছে।
এই জ্বালানি ব্যবহার করেই সামরিক জান্তা গত ১৫ মাসে এক হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে।
মায়ানমার পিস মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি জ্বালানি সরবরাহ শুরুর পর থেকে সরকারি বিমান হামলায় অন্তত এক হাজার ৭২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল গ্রাম, স্কুল, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থাপনা। রয়টার্স বলছে, ইরানের ভূমিকা এতদিন আলোচনার বাইরে থাকলেও অনুসন্ধানে প্রথমবারের মতো তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সরবরাহে ব্যবহার করা হয়েছে ‘রিফ’ ও ‘নোবেল’ নামের দুটি ট্যাংকার, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
জাহাজগুলো ইলেকট্রনিক স্পুফিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান গোপন করে ইরান থেকে মায়ানমারে যাত্রা করেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, জাহাজগুলো ভুয়া অবস্থান সংকেতের মাধ্যমে ইরাক বা বাংলাদেশের বন্দর দেখালেও বাস্তবে জ্বালানি তুলেছে ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে।
জেট ফুয়েলের পাশাপাশি ইরান মায়ানমারে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়াও পাঠাচ্ছে বলে জানা গেছে। সাধারণত সার হিসেবে ব্যবহৃত এই ইউরিয়া সামরিক জান্তা ড্রোন ও প্যারাগ্লাইডার থেকে নিক্ষেপে সক্ষম বোমা তৈরিতে ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা দুই সদস্য। বিশ্লেষকদের মতে, বছরে চার থেকে ছয় লাখ টন ইউরিয়া সরবরাহ করা হচ্ছে দেশটিতে।
জাতিসংঘের মায়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ রয়টার্সকে বলেন, ইরান থেকে আসা এই জ্বালানি সরাসরি গণহত্যাকে উসকে দিচ্ছে। তিনি ইরানকে এই সহিংসতায় সহায়তার জন্য দায়ী করার আহ্বান জানান। তবে ইরানের জাতিসংঘ মিশন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মায়ানমারের সামরিক সরকারও কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য উভয় দেশের জন্যই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কঠোর নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান নতুন রাজস্ব ও প্রভাব খুঁজছে, আর সামরিক জান্তা আকাশে আধিপত্য বজায় রেখে বিদ্রোহ দমনে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
চিন ও রাখাইন প্রদেশের বহু গ্রামে এখন আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। ভানহার বাসিন্দাদের অনেকেই আবার বিমান হামলার আশঙ্কায় রাতে ঘরে না থেকে জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছেন। আহত এক বাসিন্দা প্রশ্ন রাখেন, নিরীহ শিশু ও সাধারণ মানুষের ওপর বোমা ফেলেই কি এই যুদ্ধের সমাধান সম্ভব?
ইরান-মায়ানমার সম্পর্ক
২০১৭ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারের গণহত্যার মুখে লাখ লাখ মুসলিম রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিক বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এরপর ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানির প্রশাসন এই গণহত্যার তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি ইসলামী দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তবে ২০২১ সালে মায়ানমার জান্তার হাতে সু চি সরকারের পতনের পর দেশটিতে অস্ত্র বিক্রি শুরু করে ইরান।
জান্তাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণকারী একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্রের মতে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে, ইরানের একটি সরকারি প্রতিনিধিদল গোপনে মায়ানমার সফর করে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে। এই সফরের খবর প্রথম এশিয়া টাইমস প্রকাশ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিরাপত্তা সূত্রটি জানিয়েছে, তারা সেখানে গাইডেড মিসাইল এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামসহ ইরানী অস্ত্র বিক্রি করতে এসেছিল।
এ বিষয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সিনিয়র ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘আপনি যেখানে কৌশলগত স্বার্থের কথা বলেন, সেখানেই আদর্শকে নমনীয় করতে পারেন। এবং অবশ্যই মায়ানমার এমন একটি দেশ যা তাদের (ইরান) কাছে আকর্ষণীয়।
এর মধ্যে দেশটিতে চলমান নির্বাচনের ঠিক আগে টাটমাডো বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালায় জান্তা বাহিনী।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে আছে জান্তা সরকার।
রাজ্যের ম্রাউক উ শহরের প্রধান হাসপাতালে এক হামলায় রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ৩০ জন নিহতের পাশাপাশি ৭০ জন আহত হন। গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান হামলাগুলির মধ্যে এটি ছিল একটি।
এর মাত্র কয়েকদিন আগে ‘রিফ’-জাহাজে করে অঞ্চলটিতে প্রায় ১৫,০০০ মেট্রিক টন জেট জ্বালানি খালাস করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ইরানি জাহাজটির ক্রুরা ইরাকের বসরাহ তেল টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে যাওয়ার মিথ্যা তথ্য দেখিয়ে মায়ানমারে জেট ফুয়েল নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।
রয়টার্সকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা বলেছেন যে, তিনি এই জালিয়াতির ঘটনা সম্পর্কে অবগত নন। অন্যদিকে ইরাক সরকার মন্তব্যের জন্য অনুরোধের জবাব দেয়নি।
জানুয়ারির শেষের দিকে যখন ইরানি বিক্ষোভ দমন করার মুহূর্তে সিনম্যাক্সের স্যাটেলাইট তথ্যে দেখা গেছে, ‘নোবেল’ জাহাজ আবার ইরাকের দক্ষিণ প্রান্তে নোঙর করার ভুল তথ্য দিচ্ছে। বাস্তবে জাহাজটি ইরানের বন্দর আব্বাস বন্দরের কাছে আবারও যাত্রা শুরু করার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেসময় ‘রিফ’ জাহাজ লোড করা শেষে ইয়াঙ্গুনের দিকে ফিরে যাচ্ছিল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।