মিয়ানমারে নতুন পার্লামেন্টে ১৬৬ সামরিক প্রতিনিধি, প্রভাব আরও জোরালো হল সেনাবাহিনীর

মিয়ানমারে নতুন পার্লামেন্টে ১৬৬ সামরিক প্রতিনিধি, প্রভাব আরও জোরালো হল সেনাবাহিনীর

মিয়ানমারে নতুন পার্লামেন্টে ১৬৬ সামরিক প্রতিনিধি, প্রভাব আরও জোরালো হল সেনাবাহিনীর
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের সামরিক শাসকগোষ্ঠী আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় নতুন পার্লামেন্টের জন্য সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদের নাম প্রকাশ করেছে। সামরিক বাহিনীর সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) জান্তার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর এই তালিকা প্রকাশ করা হলো।

জান্তা-নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশন (ইউইসি) চলতি মাসের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে উভয় কক্ষের জন্য মোট ১৬৬ জন সামরিক প্রতিনিধির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই প্রতিনিধিদের সরাসরি মনোনীত করেছেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। সামরিক বাহিনীর প্রণীত ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য মোট আসনের ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত রয়েছে।

চলমান সংঘাতের কারণে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোটগ্রহণ সম্ভব না হওয়ায়, এবারের পার্লামেন্টে সামরিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় আরও বেশি প্রভাবশালী হতে যাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী ৬৬৪ আসনের ইউনিয়ন পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য নিশ্চিতভাবে ১৬৬টি আসন বরাদ্দ। বাকি ৪৯৮টি আসন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন।

দেশজুড়ে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে বহু এলাকায় ভোট অনুষ্ঠিত না হওয়ায়, নতুন পার্লামেন্টে মাত্র ৪২০ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য যোগ দিতে পারবেন। এর সঙ্গে ১৬৬ জন সামরিক মনোনীত সদস্য যুক্ত হলে মোট সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৮৬ জনে।

এই হিসাব অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর ১৬৬টি আসন নতুন পার্লামেন্টের মোট আসনের প্রায় ২৮ শতাংশ দখল করবে, যা সংবিধানে নির্ধারিত ২৫ শতাংশের চেয়েও বেশি প্রভাব নিশ্চিত করছে।

নিম্নকক্ষে জেনারেলদের আধিপত্য

নিম্নকক্ষ বা পিথু হ্লুত্তাও-এ (নিম্ন পরিষদ) ১১০ সদস্যের সামরিক ব্লকের নেতৃত্বে রয়েছেন মেজর জেনারেল ইয়ে কিয়াও থু। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ১০ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, ১৮ জন কর্নেল, ৪২ জন লেফটেন্যান্ট কর্নেল, ২৭ জন মেজর এবং ১২ জন ক্যাপ্টেন। এই প্রতিনিধিদের মধ্যে স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় দুই ডজন নারী কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ বা অ্যামিওথা হ্লুত্তাও-এ (উচ্চ পরিষদ) স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর মোট ৫৬ জন সামরিক প্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন মেজর জেনারেল কিয়াও থুরা আয়ে। এই তালিকায়ও অন্তত ছয়জন নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে উভয় কক্ষেই অধিকাংশ মনোনীত প্রতিনিধি স্থলবাহিনী থেকে আসা।

ইউএসডিপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নিশ্চিত মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতা

নির্বাচনে ইউএসডিপি সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত আসন দখল করায় নতুন পার্লামেন্ট কার্যত সামরিক বাহিনী ও সাবেক জেনারেলদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সংবিধান অনুযায়ী, সামরিক প্রতিনিধিরা একটি ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারেন। একই ক্ষমতা রয়েছে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষেরও। এই তিনজন ভাইস-প্রেসিডেন্টের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়। বাস্তবে সামরিক ব্লকের মনোনীত ভাইস-প্রেসিডেন্ট কার্যত সেনাপ্রধানেরই পছন্দের ব্যক্তি হয়ে থাকেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউ থেইন সেইনের শাসনামলে সাবেক জেনারেল টিন অং মিন্ত ও- সামরিক ব্লকের নির্বাচিত ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে অপসারিত ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারের সময় সামরিক ব্লকের পছন্দ ছিলেন মিন্ত সোয়ে, যিনি বর্তমান শাসনামলে নামমাত্র ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর গত বছর মৃত্যুবরণ করেন।

সংবিধানগত কাঠামো এবং ইউএসডিপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিলিয়ে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে, যদি তিনি সর্বোচ্চ পদে যেতে চান। সামরিক ব্লক তাঁকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করতে পারবে এবং ইউএসডিপির ভোটে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় কোনো বাধা থাকবে না।

সম্প্রতি মিন অং হ্লাইং দাবি করেন, জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে সংসদে সামরিক উপস্থিতি কমানো হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে ২০০৮ সালের সংবিধান মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ‘নেতৃত্বমূলক ভূমিকা’ নিশ্চিত করে রেখেছে।

সংঘাত অব্যাহত

এদিকে, কাচিন, কায়াহ, কারেন, চিন ও রাখাইন রাজ্যসহ মধ্য মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় এখনো তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এসব অঞ্চলে সামরিক জান্তা জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ও পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে, যার ফলে দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

প্রসঙ্গত, নতুন পার্লামেন্ট গঠনের মাধ্যমে মিয়ানমারে সামরিক শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আরও দৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *