ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পর্যটকের সেবায় কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মীরা

ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পর্যটকের সেবায় কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মীরা

ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পর্যটকের সেবায় কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মীরা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ঈদ মানেই পরিবার, স্বজন আর আনন্দঘন মুহূর্ত। কিন্তু কক্সবাজারের হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে কর্মরত অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের কাছে ঈদ মানে কাজের ব্যস্ততা আর নীরব কষ্ট। ঈদের পর থেকেই পর্যটকের চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এবারও অনেক কর্মচারী বাড়ি যেতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদে নিজের ঈদের খুশি বিসর্জন দিয়েছেন তারা।
ঈদের দিন কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা যায় কেউ রুম পরিষ্কার করছেন, কেউ অতিথিদের খাবার পরিবেশন করছেন, আবার কেউ রিসেপশনে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের তথ্য দিচ্ছেন। বাইরে ঈদের আনন্দ আর ভেতরে কর্মব্যস্ততা এমন দৃশ্যই চোখে পড়ছে পর্যটন শহরে।
শহরের একটি তারকামানের হোটেলের সহকারী ম্যানেজার মো. আদনান শরীফ বলেন, “এবার ঈদটাও স্বজনদের নিয়ে উদযাপন করা হলো না। প্রতি বছরই ভাবি ঈদে বাড়ি যাব, পরিবার নিয়ে কোথাও একটু ঘুরতে যাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয় না।  পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করে থাকে। ফোন দিয়ে বলে তারা শুধু বলে- কবে বাড়ি যাব? তখন খুব খারাপ লাগে।”
কক্সবাজারের হোটেল বিচ কর্ণারের কর্মচারী সাদিকুল ইসলাম বলেন, “ঈদের দিন সবাই নতুন জামা পরে ছবি তোলে, ঘুরতে যায়। আর আমরা সারা দিন ডিউটিতে থাকি। কখনো কখনো মনে হয় আমরাও মানুষ, আমাদেরও তো পরিবার আছে। কিন্তু চাকরিটা না থাকলে সংসার চলবে না।”
মেরিন প্লাজা হোটেলের রুম সার্ভিস দেন এরশাদুর রহমান। তিনি বলেন, “ঈদের দিন সকাল থেকে মা-বাবা অপেক্ষা করে আছে, ফোন দিলে তারা শুধু বলে তুই কবে বাড়ি আসবি বাবা? তখন বলার কিছু থাকে না। আসবো বলে পাহাড় সমান দুঃখ নিয়ে ফোন কেটে দেই।”
কক্স কাবাব হাউজ এন্ড রেস্টুরেন্টের ওয়েটার আবদুল্লাহ বলেন, “ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়ে সরাসরি কাজে চলে এসেছি। ভাই-বোনরা সবাই বাড়িতে একসঙ্গে ঈদ করছে, আমি শুধু ভিডিও কলে দেখেছি। পেটের দায়ে কাজ করতেই হচ্ছে।”

ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পর্যটকের সেবায় কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মীরা

আরেকজন কিচেন সহকারী ফরিদ উল্লাহ শাহীন বলেন, “আমার দুইটা ছোট বাচ্চা। তারা নতুন জামা পরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু যেতে পারিনি। বাচ্চারা ফোনে বার বার বলছিল বাবা তুমি কবে আসবে? তখন নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।”
হোটেল মোটেল জোনের সি কক্স ভিউ হোটেলের নিরাপত্তাকর্মী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “ঈদের সময় ডিউটি সবচেয়ে বেশি থাকে। তখন ছুটি পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা কাজ না করলে পরিবার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও কাজ করতে হচ্ছে।”
হোটেল সাউথ বিচ রিসোর্টের পরিচালক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ঈদের সময় কর্মচারীদের কষ্টটা মালিকপক্ষও বোঝে। তিনি বলেন, “ঈদের সময় অনেক কর্মচারী বাড়ি যেতে পারে না এটা আমাদের জন্যও কষ্টের। কিন্তু পর্যটকের চাপ সামাল দিতে তাদের থাকতে হয়। আমরা চেষ্টা করি যেন কর্মচারীরা ঈদের দিন ভালো খাবার পায় এবং তাদের জন্য আলাদা সম্মানী বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়।”
হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ঈদের পর থেকেই কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। তাই অনেক কর্মচারীকে ঈদের সময়েও থাকতে হয়।
তিনি বলেন, “আমরা জানি তারা পরিবার থেকে দূরে থেকে কাজ করছেন। তাদের এই ত্যাগের কারণেই পর্যটন খাত সচল থাকে। মালিকপক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করছি তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানোর জন্য।”
কক্সবাজার হোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটন শিল্পের মূল শক্তি এই কর্মচারীরাই। তিনি বলেন, “ঈদের সময় পরিবার ছেড়ে কাজ করা খুব কষ্টের বিষয়। কিন্তু পর্যটকদের সেবা দিতে গিয়ে তারা যে ত্যাগ স্বীকার করছে, সেটি সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা চাই তাদের জন্য ভবিষ্যতে আরও ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।”
এদিকে ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার আগেই কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ইতোমধ্যে ব্যস্ততা বেড়েছে। আর সেই ব্যস্ততার মাঝেই নীরবে নিজের ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য কর্মচারী যাদের ত্যাগেই টিকে আছে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন শিল্প।
  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *