মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুঞ্জন-সন্দেহ-অবিশ্বাস

মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুঞ্জন-সন্দেহ-অবিশ্বাস

মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুঞ্জন-সন্দেহ-অবিশ্বাস
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

আলতাফ পারভেজ

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গত দেড় মাসে দুনিয়া তোলপাড় হয়ে গেল। ১০টির বেশি দেশে বোমা পড়ল। হাজার হাজার মানুষ মরল। বাংলাদেশিও মারা গেল কয়েকজন। ভূরাজনীতির আন্তর্জাতিক ছকও বেশ পাল্টে গেল। চারদিকে এখন সেসব নিয়েই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এর মাঝেই মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস ছড়ানোর মতো খবর বের হচ্ছে। তবে যাঁরাই এই কর্মসূচি সম্পর্কে সামান্য লেখাজোখা করেছেন, তাঁরা এর ব্যাপকতা ও গভীরতা নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি এখনো—যদিও ইতিমধ্যে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দেশটির এ রকম একটি কর্মসূচির ইঙ্গিত দেয়।

কবে থেকে বামারদের এই আগ্রহ

চলতি শতাব্দীর একেবারে শুরু থেকে মিয়ানমারের শাসকদের পারমাণবিক বাসনার লক্ষণ দেখা যেতে থাকে। ২০২৫-এ জান্তা সরকার এ বিষয়ে কেবল এটুকু স্বীকার করে, তারা ছোটখাটো একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে যাচ্ছে। তাদের দাবি, রাশিয়া এ ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। যথারীতি পারমাণবিক শক্তিধর নবীন দেশগুলোর মতোই মিয়ানমারের নীতিনির্ধারকেরাও বলছেন, ‘শান্তিপূর্ণ কাজে’ই তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। গত বছর ৫ মার্চে এ নিয়ে চুক্তি হয়।

মিয়ানমারের জান্তাদের প্রযুক্তি সংগ্রহের উচ্চাভিলাষে রাশিয়ার সহায়তার এটাই অবশ্য প্রথম বা শেষ উদ্যোগ ছিল না। ২০০৭ সালে প্রথম উভয় দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়ে সহযোগিতার বিষয় জানা যায়। ২০২৩ সালে, এখনকার প্রেসিডেন্ট জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রথম বিষয়টা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন। একই বছর ৭ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার রোসটাম সংস্থাও এ বিষয়ে ‘আন্ত সরকারি চুক্তি’র কথা জানায়। ২০২৩-এর চুক্তির ধারাবাহিকতাতেই গত বছরের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের চুক্তি হয়।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মিন অং হ্লাইং
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মিন অং হ্লাইং

তবে এ ঘটনায় মিয়ানমার সরকারের কারও যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। মিয়ানমারের খনিজ সম্পদের তালিকায় ইউরেনিয়াম থাকার তথ্য বহু পুরোনো। তবে তারা এটার উত্তোলন ও ব্যবহারের প্রযুক্তিতে কতটা এগিয়েছে, সেই বিষয়ে বরাবরই সন্দেহ ছিল এবং আছে। গত কয়েক বছর অবশ্য বিপুলসংখ্যক সেনা কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ সূত্রে রাশিয়া গেছেন এবং যাচ্ছেন।

সন্দেহের তির উত্তর কোরিয়ার দিকেও

মিয়ানমারের শাসকেরা যদিও বরাবর বলছেন তাঁদের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচির প্রযুক্তিগত সহায়তা আসছে কেবল রাশিয়া থেকে; কিন্তু এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুসন্ধানের ভিন্নতর দাবিও আছে। ২০০৯ সালের আগস্টে সিডনি মনিং হেরাল্ডের দুই অনুসন্ধানী সাংবাদিকের দাবি ছিল মিয়ানমারের এই প্রকল্পে উত্তর কোরিয়াও যুক্ত। তাঁদের ওই দাবি নির্ভরযোগ্য তৃতীয় কোনো সূত্র দ্বারা সমর্থিত হয়নি।

তবে ২০২৩ সালে যখন সামরিক জান্তা সরকার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন ঘটায়, তখন পারমাণবিক প্রযুক্তিকেন্দ্রিক পুরোনো সন্দেহ-অবিশ্বাস আবার ফিরে আসে, সু চির আমলে যে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল আমেরিকার চাপে বা অনুরোধে। পারমাণবিক দ্রব্যসামগ্রী পরিবহনে সন্দেহ-অবিশ্বাস থেকেই আমেরিকা প্রায় দেড় দশক আগে উত্তর কোরিয়ার মিয়ানমারমুখী একটা বড় কার্গো জাহাজকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাধা দিয়ে ফেরত যেতে বাধ্য করেছিল।

উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক বেশ কয়েক দফা বিচ্ছিন্ন ও পুনর্জীবনের চক্র পেরিয়ে বর্তমানে এক কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই দুই দেশ বেলারুশ, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে মিলে একটা স্বতন্ত্র নিরাপত্তাকাঠামো গঠনের কথা জানায়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনুমান রাশিয়া বা চীন মিয়ানমারকে সাধারণ যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করলেও পারমাণবিক প্রযুক্তি লেনদেনের বেলায় তাদের ছদ্ম প্রতিনিধি হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে উৎসাহিত করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রহীন বাংলাদেশের জন্যও মিয়ানমারের এসব খবরাখবর উদ্বেগের। দেশের তিন দিকে আরএসএস পরিচালিত পারমাণবিক শক্তিধর ভারতের পাশাপাশি সীমান্তের বাকি অংশেও যদি বাংলাদেশ-বিদ্বেষী বামার তাতমাদো পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে, নিশ্চিতভাবে সেটা চিরস্থায়ী এক নিরাপত্তাঝুঁকি। পাঁচ প্রতিবেশীর মধ্যে বাংলাদেশের শাসকদের সঙ্গেই কেবল মিয়ানমারে শাসকদের সম্পর্ক শীতল।

মিয়ানমার সরকার পারমাণবিক প্রযুক্তির সংগ্রহ ও ব্যবহারের পক্ষে জ্বালানিবিষয়ক যেসব যুক্তি দেয় সেগুলো সামান্যই বিশ্বাসযোগ্য। দেশটিতে গ্যাসের ব্যাপক মজুত আছে, জলবিদ্যুতেরও বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানির অনেক বিকল্প থাকার পরও সামরিক নেতাদের পারমাণবিক প্রযুক্তি সংগ্রহের লাগাতার চেষ্টা এ বিষয়ে সন্দেহ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের আর্থিক অবস্থা এ রকম ব্যয়বহুল একটা খাত গড়ে তোলার জন্য উপযোগী না হওয়া সত্ত্বেও নেতারা যেভাবে এ বিষয়ে মরিয়া হয়ে দশকের পর দশক লেগে আছেন, সেটাও বিস্ময় জাগায়।

পারমাণবিক বিষয়ে মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অনেক!

রাশিয়ার কাছ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি সংগ্রহের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই ২০১৬ সালে মিয়ানমার পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন করেছে। পরে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী চুক্তিতেও তারা স্বাক্ষর করে। এসবই ঘটে অং সান সু চির আমলে এবং তাতে মিয়ানমারকে নিয়ে পারমাণবিক উদ্বেগ কিছুটা কমে। তবে ২০২১-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমাগত ঘনিষ্ঠতার মাঝে এই উদ্বেগ আবার ফিরে আসছে।

মিয়ানমারের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার মনে করেন, উত্তর কোরিয়া যেভাবে এই প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তিধর পশ্চিমা শক্তিগুলোর হুমকিকে সফলভাবে মোকাবিলা করেছে, মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বও দীর্ঘ মেয়াদে এ রকম এক পথকে টেকসই ভাবতে পারে।

চীন-রাশিয়ার সঙ্গে নেপিডোর সরকারের ঘনিষ্ঠতা যত গভীর, ততটাই শীতল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে। সম্ভবত সেই অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালে রাশিয়া-মিয়ানমার পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। একই বছর ভয়েস অব আমেরিকা ১৫ ফেব্রুয়ারি লিখেছে, মিয়ানমারের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর এই বিষয়ে কার্যকর বৈশ্বিক প্রটোকল মেনে হচ্ছে কি না, সে সম্পর্কে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির কাছে উত্তর চেয়েও পায়নি তারা। ওই প্রতিবেদনে মিয়ানমারের একজন পদার্থবিদ চিন মঙ মঙকে উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়, রাশিয়ার রোসাটাম বাংলাদেশের দক্ষিণের এই প্রতিবেশীকে ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ দিচ্ছে। রোসাটাম মিয়ানমারে পারমাণবিক প্রযুক্তি জনপ্রিয় করতে শিক্ষার্থীদের মাঝে নানা ধরনের মেলারও আয়োজন করেছে বিগত বছরগুলোতে।

ভারতসহ কয়েকটি দেশের সামরিক জার্নালে মিয়ানমারের পারমাণবিক অভিলাষ নিয়ে আলোচনার সময় গুগল আর্থের মাধ্যমে সংগৃহীত দেশটির মধ্যাঞ্চলের পূর্ব মান্দালে এলাকার বিশাল আয়তনের টানেল-জাতীয় অবকাঠামোর নির্মাণের কথাও বলা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দুজন খ্যাতনামা পারমাণবিক বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক তদন্ত এড়াতে বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমারে আশ্রয় নেওয়ার পর আলোচ্য প্রসঙ্গ বাড়তি গতি পায়। পরবর্তী সময়ে ওই দুই বিজ্ঞানীর আর কোনো হদিস মেলেনি।

যাবতীয় জল্পনা-কল্পনা গুরুত্ব পাওয়ার মতো কি না?

বিশ্বে ইতিমধ্যে প্রায় ৯টি দেশের হাতে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র আছে। ফলে আরও দেশের এই অস্ত্র সংগ্রহের আগ্রহ থাকবে এটা অস্বাভাবিক নয়। ইসরায়েলের হাতে এই প্রযুক্তি থাকলে ইরানের হাতে না থাকার শক্ত কোনো যুক্তি নেই। তেমনি চীন-ভারত-পাকিস্তানের কোষাগারে বিপুল সংখ্যায় এই অস্ত্র মজুতের মাঝে কাছাকাছি দেশ মিয়ানমারকে কী বলে এই প্রযুক্তি সংগ্রহের বাসনায় বাধা দেওয়া যাবে?

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, মিয়ানমারের ছোট ছোট অনেক জাতির বিরুদ্ধে বামার সশস্ত্র বাহিনী যেভাবে ক্রমাগত জাতিগত ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালাচ্ছে, সেটাই আরও তীব্র করে তুলতে গিয়ে বিশ্বজনমতকে তোয়াক্কা না করার রক্ষাকবচ হিসেবে এই প্রযুক্তি পেতে চাইতে পারে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী।

দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রহীন বাংলাদেশের জন্যও মিয়ানমারের এসব খবরাখবর উদ্বেগের। দেশের তিন দিকে আরএসএস পরিচালিত পারমাণবিক শক্তিধর ভারতের পাশাপাশি সীমান্তের বাকি অংশেও যদি বাংলাদেশ-বিদ্বেষী বামার তাতমাদো পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে, নিশ্চিতভাবে সেটা চিরস্থায়ী এক নিরাপত্তাঝুঁকি। পাঁচ প্রতিবেশীর মধ্যে বাংলাদেশের শাসকদের সঙ্গেই কেবল মিয়ানমারে শাসকদের সম্পর্ক শীতল। এর মাঝে দুই মাস ধরে চীন ও রাশিয়ার স্পষ্ট সবুজসংকেতের মাঝে গণতন্ত্রপন্থী ও জাতিগত স্বায়ত্তশাসনপন্থীদের বিরুদ্ধে তাতমাদো যেভাবে পোড়ামাটি নীতি নিয়ে এগোচ্ছে তাতে ভবিষ্যতের মিয়ানমার নতুন এক চেহারায় আবির্ভূত হবে বলে অনুমান করা যায়।

  • আলতাফ পারভেজ, গবেষক ও লেখক
  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *