যোগীর উত্তর প্রদেশে প্রতিদিন গড়ে পুলিশের পাঁচটি এনকাউন্টার

যোগীর উত্তর প্রদেশে প্রতিদিন গড়ে পুলিশের পাঁচটি এনকাউন্টার

যোগীর উত্তর প্রদেশে প্রতিদিন গড়ে পুলিশের পাঁচটি এনকাউন্টার
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

দুই দশক আগে নানা পাটেকর অভিনীত সেই হিন্দি সিনেমা ‘অব তক ছাপ্পান্ন’র কথা মনে আছে কি? একটু স্মরণ করুন, সেই সিনেমায় নানা পাটেকর অভিনয় করেছিলেন এক সৎ, নির্ভীক ও ঠান্ডা মাথার পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায়, যিনি অপরাধীদের বাঁচিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন না বলে খুন করে দিতেন। তাঁর চরিত্রের নাম ছিল সাধু আগাশে, যিনি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে ৫৬ জন ‘অপরাধীকে’ নিকেশ করেছিলেন।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি সেই সিনেমার নায়ক সাধু আগাশেরা আজ উত্তর প্রদেশে গিজগিজ করছে। বিচারের প্রতীক্ষায় না থেকে মহল্লায় মহল্লায় এনকাউন্টারে তারা মেরে ফেলছে একের পর এক ‘অপরাধীকে’। নইলে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ৯ বছরের শাসনে উত্তর প্রদেশে ১৭ হাজার ৪৩টি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটত না। অর্থাৎ গড় হিসাবে রাজ্যে এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে দিনে ৫টি করে।

মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ প্রায়ই কৃতিত্বের সঙ্গে বলেন, তাঁর আমলে উত্তর প্রদেশ অপরাধ ও অপরাধীমুক্ত হয়েছে। দাবি যে নেহাত কাল্পনিক নয়, তার প্রমাণ মিলেছে গতকাল সোমবার রাজ্য সরকার থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে। তাতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০২৬–এর মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে ১৭ হাজার ৪৩টি এনকাউন্টার বা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ২৮৯ জন ‘কুখ্যাত অপরাধী’ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৮৩৪ জন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৪ হাজার ২৫৩ জন অপরাধীকে।

এ নিয়ে বিচার বিভাগের কটু কথাও যে সরকারকে শুনতে হয় না, তা নয়। গত জানুয়ারি মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতিরা কটাক্ষ করে বলেছিলেন, উত্তর প্রদেশে এনকাউন্টারের ঘটনা এখন মুড়িমুড়কির মতো ঘটে চলেছে। এগুলো ঘটানো হচ্ছে হয় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শিক্ষা দিতে, নতুবা ওপর মহলকে খুশি করতে।

বিচারপতি অরুণ কুমার সিং দেশোয়াল এক মামলার শুনানিতে বলেছিলেন, তাঁর আদালতে এমন মামলাও প্রায়ই আসছে, যেখানে সাধারণ চুরিচামারি ঠেকাতেও পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। তারপর তা ঢাকতে এনকাউন্টারের তত্ত্ব খাড়া করছে।

রাজ্য সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দাগি অপরাধী ও সংগঠিত অপরাধ চক্র রাজ্য থেকে প্রায় নির্মূল করা গেছে। এ কাজে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৮ জন পুলিশ কর্মী, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন।

ভারতে এনকাউন্টার নীতি প্রথম শুরু হয়েছিল মুম্বাইয়ে আশির দশক নাগাদ। জুলিও ফ্রান্সিস রিবোইরো যখন মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বম্বে) পুলিশ কমিশনার, সেই সময় এনকাউন্টার তত্ত্বটি জনপ্রিয় হয়। তত্ত্বটি হলো, অপরাধীদের ধরা কঠিন। ধরা হলেও অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন। কারণ, আদালতে সাক্ষী দিলে প্রাণহাতে করে বাঁচতে হয়। বহু ক্ষেত্রে সাক্ষীদের আদালতে পৌঁছাতে দেওয়া হয় না। সাক্ষ্য দেওয়ার পর মেরেও ফেলা হয়। কাজেই অপরাধীদের বাঁচিয়ে রাখার মানে হয় না। অতএব ধরো ও মেরে ফেলো।

তবে মেরে ফেলার আগে পুলিশকে একটা গল্প ফাঁদতে হবে। পুলিশের ওপর হামলা করে পালানোর চেষ্টার গল্প। পুলিশের অস্ত্র ছিনতাইয়ের গল্প। আত্মনিয়ন্ত্রণে পুলিশের গুলি চালানোর গল্প।

মনে রাখতে হবে, সত্তরের দশকে মুম্বাই যখন দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী হয়ে উঠছে, সংগঠিত অপরাধ চক্রের জন্মও তখন। সেই সময় মুম্বাইয়ের জাহাজঘাটা বা বন্দর এলাকায় একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন হাজি মস্তান। তাঁর আধিপত্য ছিল প্রধানত সোনা, রুপা ও অন্যান্য চোরাচালানের জগতে।

শহরের জুয়া ও মাদকের ঠেক নিয়ন্ত্রণ করতেন আফগানিস্তান থেকে আসা ‘ডন’ লালা করিম। আর দক্ষিণি অপরাধীদের নিয়ন্ত্রক ছিলেন বরদারাজন মুদালিয়র। হাজি মস্তানের জীবনের ছায়ায় তৈরি হয়েছিল অমিতাভ বচ্চনের কালজয়ী সিনেমা ‘দিওয়ার’, যেখানে বচ্চন অভিনীত চরিত্র ‘বিজয় ভার্মা’ ডকের কুলি থেকে একজন শক্তিশালী ও প্রভাবশালী চোরাকারবারিতে পরিণত হয়েছিলেন।

সত্তরের দশকের শেষাশেষি দাউদ ইব্রাহিমের উত্থান মুম্বাইয়ের অপরাধজগতের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে তোলে। অপরাধ যত বেশি সংগঠিত হতে থাকে, ততই পুলিশের একাংশের মধ্যে প্রাধান্য পেতে থাকে ‘এনকাউন্টার তত্ত্ব’। নব্বইয়ের দশকে মুম্বাই পুলিশ কমিশনার রোনাল্ড হায়াসিন্থ মেনডোনকা ও তাঁর পর মহেশ নারায়ণ সিংয়ের আমলে ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে প্রদীপ শর্মা, দয়া নায়েক, বিজয় সালাসকরদের নাম।

প্রধানত এসব এনকাউন্টার–বিশেষজ্ঞদের হাত থেকে বাঁচতে দাউদসহ আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনরা বিদেশে পাড়ি দেন। ওই সময় থেকে মানবাধিকার কমিশন, আন্দোলনকর্মীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক চাপও বেড়ে চলে। ক্রমেই স্তিমিত হয়ে যায় মুম্বাইসহ অন্যত্র পুলিশের এনকাউন্টার নীতি।

যোগী আদিত্যনাথ ২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় এসে সেই পুরোনো নীতি আঁকড়ে ধরেন। রাজ্যের মিরাট, আগ্রা, বারানসি, বেরিলিসহ বিভিন্ন এলাকার সংগঠিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোমর কষে দাঁড়ান।

সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, এনকাউন্টারে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মিরাটে, ৯৭ জন। আহতের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজার। ওই ডিভিশনে মোট এনকাউন্টার হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা বারানসি। সেখানে ২৯ জন ‘দাগি অপরাধীর’ মৃত্যু হয়েছে। তৃতীয় স্থান আগ্রার। সেখানে মারা গেছেন ২৪ জন।

মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশকে ‘উত্তম প্রদেশে’ পরিণত করতে চান। সে জন্য তিনি চান রাজ্যকে লগ্নি উপযুক্ত করে তুলতে। লগ্নিকারকদের প্রথম চাহিদা শান্তি, দ্বিতীয় চাহিদা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

এই দুই চাহিদার উল্লেখ করে যোগী বারবার বলেছেন, উত্তর প্রদেশকে অপরাধমুক্ত করে তোলা তাঁর প্রথম লক্ষ্য, দ্বিতীয় লক্ষ্য স্থিতিশীলতা রক্ষা। জোড়া লক্ষপূরণে ‘এনকাউন্টার নীতি’-ই তাঁর সেরা অবলম্বন। সরকারি বিবৃতি সেই দাবি করছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *