৮ জুন নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন
![]()
নিউজ ডেস্ক
আগামী ৮ জুন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের দ্বিবার্ষিক সীমান্ত সম্মেলন। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক।
ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৮ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত দিল্লির একটি বিএসএফ স্থাপনায় চার দিনব্যাপী এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নেবে। অপরদিকে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।
সম্মেলনের শেষ দিন ১১ জুন উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে একটি যৌথ কার্যবিবরণী স্বাক্ষরের মাধ্যমে বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হবে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সীমান্ত সম্মেলনের সময় বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে ছিল। পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এবারই প্রথম দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে নয়াদিল্লির এই সম্মেলনকে দুই দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সংলাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ভারতের গুরুত্ব
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা সাধারণত এ ধরনের বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকে। তবে বর্তমান আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
পিটিআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, ভারতীয় নাগরিক ও বিএসএফ সদস্যদের ওপর সীমান্ত অপরাধীদের হামলার অভিযোগ, অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।
এছাড়া ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তকরণ, অপসারণ ও ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের পক্ষ থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম, সীমান্ত ব্যবহার করে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী চলাচল এবং ড্রোন বা আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনাও আলোচনার টেবিলে আসতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের বিষয়টি তুলবে বিজিবি
অন্যদিকে বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে আলোচিত একটি সংবেদনশীল ইস্যু। বাংলাদেশ বরাবরই এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে এবং সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে মানবিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বাড়তি গুরুত্ব
বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত, যা মোট সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি।
ভারতীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ কার্যক্রমও নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ অংশের ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার এলাকায় ইতোমধ্যে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভৌগোলিক ও অন্যান্য কারণে এখনো উল্লেখযোগ্য অংশে বেড়া নির্মাণ বাকি রয়েছে।
দীর্ঘদিনের সীমান্ত সংলাপ
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠক ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এটি বছরে একবার অনুষ্ঠিত হলেও ১৯৯৩ সাল থেকে বছরে দুইবার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে একবার ঢাকায় এবং একবার নয়াদিল্লিতে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এটি প্রথম বড় নিরাপত্তা-সংলাপ। ফলে সীমান্তে প্রাণহানি, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে এবং কোনো নতুন যৌথ উদ্যোগ ঘোষণা করা হয় কি না, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।