বিশ্ব হাতি দিবসে কাপ্তাইয়ে র্যালি ও আলোচনা সভা, গাছের চারা বিতরণ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা বাড়লেও খাদ্যসংকট, আবাসস্থল সংকোচন ও চলাচলের করিডোরে মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে কাপ্তাইয়ে বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকি। হাতির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে তাদের আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সুরক্ষার পাশাপাশি বন সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে বুধবার (১২ আগস্ট) রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে আয়োজিত র্যালি ও আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১১টায় কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি সচেতনতামূলক র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে স্কুলশিক্ষার্থী, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও বনের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। র্যালিটি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে এসে শেষ হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম। কাপ্তাই বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. জামাল হোসেনের সভাপতিত্বে এবং কাপ্তাই সহকারী তথ্য অফিসার দেলোয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, কাপ্তাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকমান আহমেদ এবং কর্ণফুলী রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার ফজলে রাব্বি সরকার। স্বাগত বক্তব্য দেন কাপ্তাই রেঞ্জ অফিসার মামুনুর রহমান।
সভায় বক্তারা জানান, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে এ এলাকায় হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬টি। বর্তমানে সেখানে আনুমানিক ৪২ থেকে ৪৫টি হাতি বিচরণ করছে। হাতির সংখ্যা বৃদ্ধি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য ইতিবাচক হলেও পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বক্তারা বলেন, মানুষের বসতি, কৃষিকাজ, সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বনাঞ্চলে খাবারের সংকট দেখা দিলে হাতি বাধ্য হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। এতে একদিকে মানুষের ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে আতঙ্কিত মানুষ হাতির ওপর আক্রমণ করলে প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়।

তাদের মতে, হাতিকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার অংশ। তাই হাতির আবাসস্থল দখল বা ধ্বংস না করা এবং হাতির প্রাকৃতিক চলাচলের পথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার বিষয়ে স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে।
সভায় হাতির চলাচলের করিডোরে বসতি, স্থাপনা কিংবা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে কোনো হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলে তাকে উত্ত্যক্ত না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত বন বিভাগকে খবর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষভাবে হাতির কাছাকাছি গিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণের প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন বক্তারা। তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও দেওয়ার জন্য অনেক সময় মানুষ হাতির খুব কাছে চলে যান। এতে আকস্মিকভাবে হাতি আক্রমণ করলে মানুষের জীবন যেমন ঝুঁকিতে পড়ে, তেমনি হাতিটিও আতঙ্কিত হয়ে আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। তাই কৌতূহলবশত হাতির কাছে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, হাতির আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি বনাঞ্চলে হাতির উপযোগী খাদ্য ও গাছপালা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের।
আলোচনা সভা শেষে বিশ্ব হাতি দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১০০ শিক্ষার্থীর মাঝে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে বন সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে তাদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হাতির আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে কাপ্তাইয়ে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান আরও নিরাপদ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব প্রজন্ম গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।