খাগড়াছড়িতে নানা আয়োজনে বর্ণাঢ্য বৈসাবি র্যালি অনুষ্ঠিত
![]()
নিউজ ডেস্ক
বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের বর্ষবরণ উৎসব বৈসাবি। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে বৈসু-সাংগ্রাই-বিঝু (বৈসাবি) ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩০ উদযাপন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বেলুন ও কবুতর উড়িয়ে বর্ণাঢ্য র্যালির উদ্বোধন করেন ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স ‘র চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী) কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা,এমপি।
র্যালিটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চেঙ্গী স্কয়ার হয়ে খাগড়াছড়ি পৌর টাউন হলে আয়োজিত পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী শিল্পীদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে অনুষ্ঠানে এসে শেষ হয়। র্যালিতে হাজার পাহাড়ী তথা ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা,বাঙ্গালী, সাওতাল তরুণ-তরুণীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে-গেয়ে এতে অংশ নেন। এসময় র্যালিটি হয়ে উঠে সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায়। মারমা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সী মানুষ রঙিন ছাতা নিয়ে র্যালিতে অংশ নেন।
এ সময় বক্তব্য রাখেন খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. গোলাম মহিউদ্দিন আহমেদ, জেলা প্রশাসক মোঃ সহিদুজ্জামান, জেলা পুলিশ সুপার মোঃ নাইমুল হক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু, জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মোঃ আবুল হাসনাত । এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডিজিএফআই ডেট কমান্ডার লে: কর্ণেল মোঃ শাহ আলম সিদ্দিকী, পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শানে আলম, জেলা পরিষদের সদস্য কল্যাণ মিত্র বড়ুয়া, সদস্য খোকনেশ্বর ত্রিপুরা, হিরন জয় ত্রিপুরা, নারী নেত্রী বাঁশরি মারমাসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, নব আনন্দের বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে পাহাড়ে আসে বৈসু/বৈসুক,সাংগ্রাই ও বিঝু অর্থাৎ বৈসাবি। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বাংলা বর্ষ বিদায় এবং বর্ষবরণে উদযাপন করা হয় এ বৈসাবি উৎসবের সাথে। আজ উৎসবমুখর পরিবেষে বর্ণাঢ্য উৎসবের আনন্দে নেচে গেয়ে ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ও সম্প্রদায়ের মানুষেরা।
ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নিজস্ব সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন উদযাপন করে এই বৈসাবি উৎসব। জাতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন করা হয় উৎসব অনুষ্ঠান। মূলত ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু/বৈসুক, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই আর চাকমা সম্প্রদায়ের বিঝু। ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা এই তিন সম্প্রদায়ের তিনটি উৎসবের নামের অদ্যাক্ষরের মিলিত রুপে এ উৎসবের নামকরণ হয়েছে বৈসাবি। এর সঙ্গে বাংলা নববর্ষের অদ্যক্ষর ‘ন’ যুক্ত করে বলা হয় বৈসাবিন।
বৈসাবি ঘিরে তিন দিন ব্যাপি পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। নানা আয়োজনে উদযাপন করা হয় এই সামাজিক উৎসব। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ বৈসাবি উদযাপন কমিটির উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে
বৈসু/বৈসুক : ত্রিপুরাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব বুইসুক বা বৈসুক। চৈত্রের শেষের দুই দিন ও নববর্ষের প্রথম দিন উদযাপন করা হয় এই উৎসব। চৈত্রের শেষ দুই দিনের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকেরা দিনকে ‘হারিবৈসু’, নববর্ষের প্রথম দিনকে বিসিকাতাল, এবং শেষ দিনকে ‘বৈইসুকমা/বুইসুকমা’ বলে থাকে। উৎসবের প্রথম দিন ত্রিপুরা ছেলেমেয়েরা ফুল তোলে। ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে। ঝুড়িতে ধান নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মোরগ-মুরগিকে ছিটিয়ে দেয়। গৃহপালিত সব প্রাণী ছেড়ে দেওয়া হয় খুব ভোরে। পরিচ্ছন্ন কাপড় পড়ে গ্রামে ঘুরে বেড়ায় ছেলেমেয়েরা। বৈসুক শুরুর দিন থেকে ‘গরয়া’ নৃত্য দল গ্রামের প্রতি ঘরের উঠানে নৃত্য পরিবেশন করে। এই লোকনৃত্যে ১৬ জন থেকে সর্বোচ্চ অনির্দিষ্ট সংখ্যক লোক পর্যন্ত অংশ নিতে পারেন। এ নৃত্য দেখতে সারা দেশের শত শত সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পী পাহাড়ের ভিন্ন এলাকায় ভিড় করেন।

সাংগ্রাই : মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই। বছরের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিন এ উৎসব উদযাপন করা হয়। সাংগ্রাই উৎসব উদযাপনের সময় মারমা তরুণ-তরুণীরা পিঠা বানায়, চালের গুঁড়া তৈরি করেন। এই সময় তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘জলকেলি’বা পানি খেলা হয়। সাংগ্রাই উৎসব এবং জলকেলি এখন যেন একে অপরের সমার্থক হয়ে গেছে। এই খেলায় যুবক-যুবতীরা একে অপরের দিকে পানি ছুঁড়েন। ভিজিয়ে দেন একে-অপরকে ও পরস্পরকে। এছাড়া, মারমারা বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় বাণী শোনেন। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে এই উৎসব হয়। সেজন্য সংক্রান্তি শব্দ থেকেই সাংগ্রাই শব্দটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়।
বিঝু : পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীরা প্রধান উৎসব বিঝু উৎসব পালন করে থাকে। তাই এখানে এনে দেয় এক অন্যরকম অনুভূতি। এই উৎসবে সাড়া পড়ে যায় সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে। উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমারা বলে ‘ফুলবিঝু’। এই দিন বিঝুর ফুল তোলা হয় এবং ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। সে দিন ফুলবিঝু সকালে নদীতে ফুল দিয়ে প্রণাম করা হয়। পরেরদিন (২য় দিন) মূল বিঝু,বাড়ি বাড়ি নানান ধরনের বাহারি খাবার রান্না করে থাকে। এদিন বিঝুর সময় ছোট ছেলে-মেয়েরা পরিচ্ছন্ন কাপড় পড়ে দল বেঁধে একে অন্যের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে যায়। প্রত্যেককের ঘরে ঘরে রান্না হয় ‘পাজন’। এটি চাকমাদের বিখ্যাত খাবার। হরেকরকম সবজি দিয়ে রান্না করা হয়। এই উৎসবে সবার প্রিয় খাবার এটি। ছেলেমেয়েরা ঘিলা খেলা, গুদু (হাডুডু) খেলায় মেতে ওঠে। তারা আকাশ প্রদীপ জ্বালায় এবং আনন্দে মেতে ওঠে। নববর্ষের দিন থাকে ঐতিহ্যবাহী খাবারের করা হয়ে থাকে। তৃতীয় দিনকে বলা হয় “গজ্জ্যা পজ্জ্যা” বিঝু বলে থাকে। অবশ্য এই শব্দের আংশিক গল্পও আছে।