‘অপাহাড়ি’ তত্ত্বের আড়ালে বিভাজনের প্রচেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে প্রথম আলোর বিভ্রান্তি সৃষ্টি

‘অপাহাড়ি’ তত্ত্বের আড়ালে বিভাজনের প্রচেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে প্রথম আলোর বিভ্রান্তি সৃষ্টি

‘অপাহাড়ি’ তত্ত্বের আড়ালে বিভাজনের প্রচেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে প্রথম আলোর বিভ্রান্তি সৃষ্টি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মোঃ সাইফুল ইসলাম

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো গতকাল বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) তাদের একটি  প্রতিবেদনে “চুক্তি লঙ্ঘন”, “ব্যত্যয়”, “সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে যে বয়ান নির্মাণ করেছে, তা আইনগত বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে বেশি প্রতিফলিত করে। প্রশ্ন হলো: এই দাবি কি সত্যিই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ভাষা ও সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

চুক্তির ১৯ নম্বর ধারা আসলে কী বলে?

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- উপজাতিদের মধ্য হতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সেই মন্ত্রীকে সহায়তা করার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে।

এই ধারায় প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিষিদ্ধ; এমন কোনো শব্দ, বাক্য বা ইঙ্গিত নেই। আবার প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ি হতে হবে; এমন বাধ্যবাধকতাও উল্লেখ নেই। অর্থাৎ চুক্তিটি একটি ন্যূনতম কাঠামো নির্ধারণ করেছে: (১) একজন উপজাতীয় মন্ত্রী, (২) একটি উপদেষ্টা কমিটি। এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদের সাংগঠনিক বিন্যাস নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি।

আইনশাস্ত্রের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো- যেখানে আইন নীরব, সেখানে নিষেধাজ্ঞা অনুমান করা যায় না। চুক্তির ভাষায় যদি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ সম্পর্কে কোনো নিষেধ না থাকে, তবে সেটিকে “লঙ্ঘন” বলা আইনি ব্যাখ্যা নয়; বরং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।

সংবিধান কি বলছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর নিয়োগের পরামর্শ দেন। মন্ত্রিপরিষদের গঠন সম্পূর্ণরূপে সাংবিধানিক ক্ষমতার আওতায় একটি নির্বাহী সিদ্ধান্ত। পার্বত্য চুক্তি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়; বরং সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দলিল।

প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ বিতর্ক: পার্বত্য চুক্তির অপব্যাখ্যা নাকি রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা?

যতক্ষণ না চুক্তির নির্দিষ্ট কোনো ধারা লঙ্ঘিত হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে অসাংবিধানিক বা চুক্তিবিরোধী বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। এখানে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে একজন পাহাড়ি প্রতিনিধিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—যা ১৯ নম্বর ধারার মূল শর্ত পূরণ করছে। অতএব সাংবিধানিকভাবে প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়া চুক্তির চেতনাকে ভঙ্গ করে, এমন দাবি টেকে না।

 পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে যা বলা আছে।
চুক্তির কোথাও প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে কোন নির্দেশনা নেই।

“আগে হয়নি” মানেই কি “অবৈধ”?

পার্থ শঙ্কর সাহার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকারের আমলে আগে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ অতীতে হয়নি, এটাই তার অবৈধতার প্রমাণ নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা পূর্বদৃষ্টান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে, কিন্তু পূর্বদৃষ্টান্ত নিজেই আইন নয়।

বাস্তবে অতীতেও এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা পাহাড়ি ছিলেন—এই তথ্য উল্লেখ করে “অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী” নিয়োগকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে প্রতিমন্ত্রীর জাতিগত পরিচয় নিয়ে কোনো শর্ত নেই। অতএব “অপাহাড়ি” শব্দের পুনরাবৃত্তি একটি আবেগনির্ভর বিভাজন তৈরি করে, আইনি যুক্তি নয়।

নির্বাচিত উদ্ধৃতি, অনুপস্থিত পাল্টা যুক্তি

প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে জেএসএস নেতার বক্তব্য, দুজন অধ্যাপকের মতামত এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আইনজীবীর মন্তব্য। সবার বক্তব্য একই সুরে—“সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়”, “ব্যত্যয়”, “লঙ্ঘন”। কিন্তু প্রতিবেদনে কোথাও সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়নি, চুক্তির ১৯ নম্বর ধারার ভাষার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, কিংবা বিপরীত আইনি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়নি।

এটি সাংবাদিকতার ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনার চেয়ে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়। যখন কোনো বিষয়ে আইনি বিতর্ক রয়েছে, তখন উভয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা ন্যূনতম পেশাগত দায়িত্ব। তা না করে একমুখী উদ্ধৃতির মাধ্যমে “লঙ্ঘন” শব্দ প্রতিষ্ঠা করা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

চুক্তির রাজনৈতিক ব্যবহার

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সমঝোতা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বহু বছর ধরে কিছু আঞ্চলিক শক্তি চুক্তিকে একটি স্থির ও অপরিবর্তনীয় দলিল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে আসছে। যখনই কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত তাদের প্রত্যাশিত বয়ানের সঙ্গে মেলে না, তখনই “চুক্তি লঙ্ঘন” তত্ত্ব সামনে আনা হয়।

প্রশ্ন হলো: প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়ায় পার্বত্য জনগোষ্ঠীর কোনো সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়েছে কি? জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ বা উপদেষ্টা কমিটির কাঠামো কি পরিবর্তিত হয়েছে? চুক্তির কোনো ধারার ভাষা কি লঙ্ঘিত হয়েছে? যদি উত্তর “না” হয়, তবে এই বিতর্কের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক।

প্রশাসনিক বাস্তবতা বনাম আবেগীয় রাজনীতি

একটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়া মানেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারসাম্য নষ্ট, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং প্রশাসনিক সমন্বয়, কেন্দ্র-স্থানীয় যোগাযোগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল অঞ্চল, এখানে উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা ও নিরাপত্তা সবক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিপরিষদের একটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্তকে “পাহাড় বনাম সমতল” দ্বন্দ্বে রূপ দেওয়ার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও আস্থার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সর্বোপরি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সমালোচনা যদি আংশিক তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আইনি ভিত্তিহীন দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়; বরং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বহু সংঘাত ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাস বহন করে। এখন প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, আইনি বিশ্লেষণ এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। চুক্তির ভাষা যেখানে স্পষ্ট, সেখানে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা দিয়ে প্রথম আলো কর্তৃক পরিকল্পিত উত্তেজনা তৈরি করা কারও মঙ্গল বয়ে আনে না।

সংবিধান ও আইনের আলোকে চুক্তি মানা হোক, কিন্তু চুক্তির অপব্যাখ্যা করে নয়।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।