প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ বিতর্ক: পার্বত্য চুক্তির অপব্যাখ্যা নাকি রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা?
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
নতুন মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রাঙামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ান এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের নিয়োগকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ধরনের পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কিছু গোষ্ঠী দাবি করছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল। প্রশ্ন হচ্ছে; এই দাবির কোনো আইনগত বা চুক্তিগত ভিত্তি আছে কি?
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (ঘ) এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, উপজাতিদের মধ্য হতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সেই মন্ত্রীকে সহায়তা করার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে। কিন্তু চুক্তির কোথাও প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিষিদ্ধ, এমন কোনো ভাষা নেই। আবার প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ি, বাঙ্গালি, বা পাহাড়ের বাসিন্দা হতে হবে- এমন বাধ্যবাধকতাও উল্লেখ নেই। অর্থাৎ চুক্তি একটি ন্যূনতম কাঠামো নির্ধারণ করেছে, কিন্তু সাংবিধানিকভাবে সরকার মন্ত্রিপরিষদ গঠনে যে ক্ষমতা ভোগ করে, তা সীমিত করেনি।

চুক্তিতে একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ও একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের প্রস্তাবনা উল্লেখ আছে। কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী, তিন পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্যগণ, তিন সার্কেল চীফ (চাকমা, বোমাং, মং) এবং সরকারের মনোনীত তিনজন অ-উপজাতীয় সদস্য।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর নিয়োগের পরামর্শ দেন। এই সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ একটি নির্বাহী সিদ্ধান্ত, যা চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; যতক্ষণ না চুক্তির নির্দিষ্ট কোনো ধারা লঙ্ঘিত হচ্ছে। এখানে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে একজন পাহাড়ি প্রতিনিধিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা চুক্তির মূল চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। অতএব প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে “চুক্তিভঙ্গ” আখ্যা দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, কিন্তু আইনি বিশ্লেষণে তা টেকে না।
বাস্তবে এই বিতর্কের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পাহাড়ের সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফসহ কিছু উগ্র সংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চুক্তিকে নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। যখনই কেন্দ্রীয় সরকার বা রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত তাদের একচ্ছত্র বয়ানের বাইরে যায়, তখনই “চুক্তি লঙ্ঘন” তত্ত্ব সামনে আনা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গতকাল থেকে যে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে, তা মূলত সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে পাহাড়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা।
প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী থাকলে কি পার্বত্য জনগোষ্ঠীর অধিকার খর্ব হয়? নাকি উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক সমন্বয় ও কেন্দ্র-স্থানীয় যোগাযোগ আরও কার্যকর হয়? একটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়া মানেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারসাম্য নষ্ট, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের স্বার্থে প্রতিমন্ত্রী পদ একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পার্বত্য চুক্তি একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দলিল, যা সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে নয়। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। অতএব প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের মতো সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগকে চুক্তি লঙ্ঘন বলা আসলে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যার শামিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেখানে যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে “পাহাড় বনাম সমতল” দ্বন্দ্বে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে করে সাধারণ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ ও উত্তেজনা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা ও নিরাপত্তা, সবক্ষেত্রেই সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। সেখানে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভাজনের রাজনীতি পাহাড়ের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পরিপন্থী।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আংশিক তথ্য তুলে ধরে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে যেন সরকার চুক্তিকে উপেক্ষা করেছে। অথচ চুক্তির ১৯ নম্বর ধারার ভাষ্য পরিষ্কার মন্ত্রী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রী নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই। আইনের ভাষা যেখানে নীরব, সেখানে নিষেধাজ্ঞা অনুমান করে নেওয়া যায় না। আইনশাস্ত্রে এটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি।
অতএব এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোনো নিয়োগ কি চুক্তির নির্দিষ্ট ধারার পরিপন্থী? যদি না হয়, তবে এটিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি করা কাদের স্বার্থে? পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে যারা সদা তৎপর, তাদের জন্য এমন ইস্যু একটি সুবিধাজনক হাতিয়ার।
পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল অঞ্চল; এখানে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ অপরিহার্য। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন তথ্যভিত্তিক হয়। চুক্তির অপব্যাখ্যা দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনোভাবেই দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, কিছু গোষ্ঠী এখনও শান্তির রাজনীতির বদলে উত্তেজনার রাজনীতিকেই বেছে নিতে চায়।
রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি আইনগত ভিত্তিহীন হয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তবে তা গণতান্ত্রিক চর্চা নয়, বরং প্রপাগান্ডা। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বহু সংঘাত ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাস বহন করে। এখন প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও পারস্পরিক আস্থার রাজনীতি, অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তির নয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।